মাগো ওরা বলে কবিতা – আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

মাগো ওরা বলে কবিতা – এটি একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনাকে উপজীব্য করে রচিত। এ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন, মায়ের ছেলেরা কী করে মাতৃভাষার মানরক্ষা করতে গিয়ে বুক পেতে দেয়। আর ফিরে আসে লাশ হয়ে।

 

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ 3 Gurukul Live মাগো ওরা বলে কবিতা - আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

 

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৪ – ১৯ মার্চ, ২০০১) বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের পঞ্চাশের দশকের একজন মৌলিক কবি। তার পুরো নাম আবু জাফর মুহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ খান। তার দুটি দীর্ঘ কবিতা ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ এবং ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে অভূতপূর্ব সংযোজন। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা।

১৯৮২ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের কৃষি ও পানি সম্পদ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি একুশে পদক লাভ করেছেন।কাব্যের আঙ্গিক গঠনে এবং শব্দ যোজনার বিশিষ্ট কৌশল তার স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করে। তিনি লোকজ ঐতিহ্যের ব্যবহার করে ছড়ার আঙ্গিকে কবিতা লিখেছেন। প্রকৃতির রূপ ও রঙের বিচিত্রিত ছবিগুলো তার কবিতাকে মাধুর্যমণ্ডিত করেছে

 

 

মাগো ওরা বলে কবিতা – আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

 

মাগো ওরা বলে কবিতা - আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ
মাগো ওরা বলে কবিতা – আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

 

‘কুমড়ো ফুলে ফুলে
নুয়ে পড়েছে লতাটা,
সজনে ডাঁটায়
ভরে গেছে গাছটা,
আর, আমি ডালের বড়ি
শুকিয়ে রেখেছি—
খোকা তুই কবে আসবি!
কবে ছুটি?’

চিঠিটা তার পকেটে ছিল,
ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা।

‘মাগো, ওরা বলে,
সবার কথা কেড়ে নেবে
তোমার কোলে শুয়ে
গল্প শুনতে দেবে না।
বলো, মা, তাই কি হয়?
তাইতো আমার দেরী হচ্ছে।
তোমার জন্য কথার ঝুড়ি নিয়ে
তবেই না বাড়ী ফিরবো।
লক্ষ্মী মা রাগ ক’রো না,
মাত্রতো আর কটা দিন।’

‘পাগল ছেলে’ ,
মা পড়ে আর হাসে,
‘তোর ওপরে রাগ করতে পারি!’

নারকেলের চিঁড়ে কোটে,
উড়কি ধানের মুড়কি ভাজে
এটা সেটা আরো কত কি!
তার খোকা যে বাড়ী ফিরবে!
ক্লান্ত খোকা!

কুমড়ো ফুল
শুকিয়ে গেছে,
ঝ’রে প’ড়েছে ডাঁটা;
পুঁইলতাটা নেতানো,—
‘খোকা এলি?’

ঝাপসা চোখে মা তাকায়
উঠোনে, উঠোনে
যেখানে খোকার শব
শকুনিরা ব্যবচ্ছেদ করে।

এখন,
মা’র চোখে চৈত্রের রোদ
পুড়িয়ে দেয় শকুনিদের।
তারপর,
দাওয়ায় ব’সে
মা আবার ধান ভানে,
বিন্নি ধানের খই ভাজে,
খোকা তার
কখন আসে! কখন আসে!

এখন,
মা’র চোখে শিশির ভোর,
স্নেহের রোদে
ভিটে ভরেছে।

মাগো ওরা বলে কবিতা বিশ্লেষণঃ

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কবিতায় মূলত দেশপ্রেম, নারীপ্রেম ও প্রকৃতিই প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমকালীন রাজনীতি, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটও। শুরুটা করেছেন স্বল্পকথন, ছোট ছোট বাক্যে, স্বরবৃত্তের হালকা চালে। ধীরে ধীরে পৌঁছেছেন গম্ভীর অক্ষরবৃত্তে। কথা বলেছেন স্বরাট স্বরে।

শুরুর দিকের কবিতায় তুলে এনেছেন নিম্ন-মধ্যবৃত্তের যাপিত জীবন। তাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা চিত্রিত করেছেন ছোট-ছোট পঙ্‌ক্তির কবিতায়। ছন্দ হিসেবে বেছে নিয়েছেন স্বরবৃত্তকেই। কারণ, স্বরবৃত্তে প্রাত্যহিক জীবনের সহজ-সরল ঘটনার বর্ণনা দেওয়া যায় সাবলিলভাবেই। হয়তো একারণেই কবি শুরুর দিকে এই লোকজছন্দকেই বেছে নিয়েছেন। ‘সাতনরী হার’ কাব্যের প্রায় সব কবিতা-ই এই ছোটছোট পঙ্‌ক্তির।

এখানে তিনি তুলে ধরেছেন সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনার কথা। বলেছেন একটি রাষ্ট্রের সমাজব্যবস্থায় বৈষম্য বিরাজ করলে, তার অধিবাসীরা কখনোই সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করতে পারে না। কারণ, তার আত্মিক মুক্তিরও পূর্বশর্ত অর্থনৈতিক মুক্তি; বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা। না হলে মানুষের স্বপ্নের সঙ্গে তার বাস্তবজীবনের সম্পর্ক হবে রীতিমতো সাংঘর্ষিক। সেখানে কোনোভাবেই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

 

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ 1 Gurukul Live মাগো ওরা বলে কবিতা - আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

 

 

মাগো ওরা বলে কবিতা আবৃত্তিঃ

 

আরও দেখুন: