চরমপত্র, জুন মাস ১৯৭১ – এম আর আখতার মুকুল

চরমপত্র, জুন মাস ১৯৭১ : চরমপত্র ১৯৭১ সালে স্থাপিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। এম আর আখতার মুকুল রচিত ও উপস্থাপিত চরমপত্র অনুষ্টানটি ২৫শে মার্চ থেকে শুরু করে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত পর্যন্ত প্রতিদিন প্রচারিত হয়েছে। চরমপত্র খ্যাত ব্যক্তি গেরিলা এম আর আক্তার মুকুল। এম আর আক্তার মুকুল এর পুরো নাম মুস্তাফা রওশন আখতার মুকুল।

বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিযোগীতামূলক পরিক্ষায় প্রশ্ন আসে – চরমপত্র কি বা চরমপত্র কী ? চরমপত্র অর্থ কি ? চরমপত্র বলতে বোঝায় ?  চরমপত্র কে পাঠ করতেন? চরমপত্রে কি পাঠ করা হতো? চরমপত্র খ্যাত ব্যক্তি কে? চরমপত্রের শেষ দুটি লাইন কোন ভাষায় ছিল? মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ বেতারের ভূমিকা, চরমপত্র পাঠ, চরমপত্র ও জল্লাদের দরবার, ইত্যাদি। এই আর্টিকেল গুলো পড়লে সেসব উত্তরও পরিস্কার হয়ে যাবে। চরমপত্র ডাউনলোড করা দরকার হলে, চরমপত্র pdf download খোঁজা দরকার নেই, এখান থেকেই কপি করতে পারবেন।

চরমপত্র, জুন মাস ১৯৭১ - এম আর আখতার মুকুল, একাত্তরের রণাঙ্গনের অনুপ্রেরণা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রর অনুষ্ঠান "চরমপত্র"।
একাত্তরের রণাঙ্গনের অনুপ্রেরণা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রর অনুষ্ঠান “চরমপত্র”।

চরমপত্র, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

জুন মাস ১৯৭১

চরমপত্র – ১ জুন ১৯৭১

বাংলাদেশের হানাদার দখলকৃত এলাকায় এখন প্রাক্তন নেতা উপনেতা এম.এন.এ. আর এম.পি-এর দল গিস্ গিস্ করছে। সবাই প্রাক্তন, কেউই আর Current নন। সম্প্রতি প্রাক্তন পাকিস্তানের প্রাক্তন পার্লামেন্টের প্রাক্তন নেতা খান সবুর খান একটা ঘরের মধ্যে খুলনা অশান্তি কমিটির এক সভা করেছিলেন।

ই সভায় পূর্ব বাংলার প্রাক্তন মন্ত্রী আমজাদ হোসেন আর প্রাক্তন পাকিস্তানের প্রাক্তন পার্লামেন্টের প্রাক্তন এম. এন.এ. মওলবী ইউসুফ বক্তৃতা করেছেন। সে কি বক্তৃতার জোশ্! পাকিস্তানের প্রেমে সব্বাই একেবরে প্রাণ জারে-জার করে দিলেন। সভাকক্ষ গম্ গম্ করতে লাগলো। এর দিন কয়েকের মধ্যেই নাটোরের প্রাক্তন এম.এন.এ. আব্দুল মজিদ এই খুলনাতেই এসে

মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হলো। খুলনার দালাল সম্রাট আর পালের গোদা সবুর খান বোতলটা উজাড় করে খেয়ে আমজাদকে বললেন, ‘আর খাসনে, তোকে এখন ঝাপসা দেখছি আমজাদ।’ এমন সময় খবর এল বাগেরহাট মিউনিসিপ্যালটির প্রাক্তন চেয়ারম্যন কতল হয়ে গেছে। আবার লোক মারফৎ সংবাদ এল ঢাকায় প্রাক্তন এম.পি.এ. আব্দুল হামিদকে চাকু মেরে হত্যা করা হয়েছে আর রাজশাহীর প্রেমতলীর মুসলিম লীগ নেতা সিরাজুল ইসলাম নিহত হয়েছে। সবুর খান সবার অজ্ঞাতে Army protection চেয়ে বসলেন।

এদিকে পূর্ব বাংলার প্রাক্তন পরিষদের প্রাক্তন স্পিকার আর জেলা লুটপাট সমিতির সভাপতি দিনাজপুর গমিরুদ্দিন প্রধানের বাড়িতেও হামলা হয়েছে। বেচারা গমির এখন শুমরে মরছে। এতো এক মহাগ্যাড়াকল দেখছি! হানাদার বাহিনী আর অবাঙালিদের সংগে হাত মিলিয়ে একটু টু-পাইস বানাচ্ছি, তাও লোকদের সহ্য হবে না?

পাবনার ঘটনা আরো এক ডিগ্রি উপরে। সেখানে জনৈক ক্যাপ্টেন জায়েদীকে জেলার কর্তা হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো জেনারেল ইয়াহিয়াকে বলেছেন যে, অন্ততঃ দখলকৃত এলাকায় বেসামরিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করো। তাই ক্যাপ্টেন জায়েদীর কপাল খুলেছে। ইনিও একজন প্রাক্তন এম.এন.এ। পাবনাতে এ ভদ্রলোকের শাহীন এজেন্সিস বলে একটা কোম্পানি ছিল। এই শাহীন এজেন্সিসই পাবনা-জোনে পি.আই. এর এজেন্ট ছিল।

কিন্তু যখন হিসেব চাওয়া হলো, তখন দেখা গেল এই ক্যাপ্টেন জায়েদী কয়েক লাখ টাকা গ্যাড়া মেরে দিয়েছে। বেচারার নামে তহবিল তসরুপের মামলা হলে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলেন। ভাগ্যিস পাকিস্তান হানাদার বাহিনী এসেছিল? তাইতো রতনে রতন চিনলো! দাগী আসামী ক্যাপ্টেন জায়েদীকে এরা পাবনার কর্তা বানিয়েছে। এখন বুঝুন পাবনার দখলকৃত শহর এলাকায় কি সোন্দর প্রশাসন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। চোর-বদমাইশ আর গুণ্ডার দল সব অফিসার হয়েছে। হবুচন্দ্র দেশের গবুচন্দ্র মন্ত্রী আর কি?

হায় হায়! একটা জব্বর কথা কইতে কিন্তুক ভুইল্যা গেছি। এই ক্যাপ্টেন জায়েদী কিন্তু প্রাক্তন পাকিস্তানের প্রাক্তন পার্লামেন্টের প্রাক্তন পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি ছিলেন। আর আইয়ুব খান সাহেব এঁকে খুবই পেয়ার করতেন। কিন্তুক চান্দু আমার! একটু সাবধানে থাইকো। তোমার নাম কিন্তু লিস্টির মধ্যে রইছে!

যাক আমার মনটা একটু শান্ত হয়েছে! আমাগো কক্সবাজারের প্রাক্তন মন্ত্রী মওলবী ফরিদ আহম্মদ ৭৯টা নাম জোগাড় করতে পেরেছেন। এই ৭৯টা নাম জোগাড় করে সেখানে একটা অশান্তি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কী বললেন? আমি ভুল তথ্য দিয়েছি? কিছুতেই না। ফরিদ আহম্মদও একজন প্রাক্তন মন্ত্রী। আমি মনে করাইয়া দিতাছি।

মুসলিম লীগ নেতা বোম্বাইয়ের ইব্রাহিম চুন্দ্রীগড়ের কথা মনে আছে? সেই চুদ্ৰীগড় সাহেব যখন মাস কয়েকের জন্য প্রাক্তন পাকিস্তানের পেরধানমন্ত্রী appoint হয়েছিলেন, তখন আমাগো ফরিদ সাব জেল-ওয়াজির হয়েছিলেন। সেই থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ইনি প্রাক্তন মন্ত্রীই থেকে যাবেন- বুঝেছেন! এবারের নির্বাচনে হেরে গেলেও তার এ Credit নষ্ট হয়নি। হবেও না।

সবচেয়ে টেক্কা দিয়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী বগুড়ার ফজলুল বারী। বেচারা মোনেম খাঁর উজীর সভায় সাত বছর ধরে মন্ত্রী ছিলেন। অবশ্য এবারের নির্বাচনে এক তরুণ আওয়ামী লীগ কর্মী মোঃ মোজাফ্ফরের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু তাতে কী?

দেশপ্রেমিক নেতাদের কি ঘাপটি মেরে থাকা চলে? তাই তিনি গেল মার্চ মাস থেকেই গোপনে একটু নড়াচড়া শুরু করেছিলেন। কিন্তু এ যে একেবারে সেম-সাইড হয়ে গেল? মার্চ মাসের শেষের দিকেই রংপুর থেকে একদল হানাদার সৈন্য বগুড়া শহরের নিকটে এসে হাজির হলে, দু’পক্ষেই প্রচণ্ড লড়াই হলো।

কিন্তু কথা নেই বার্তা নেই একদিন দিনে-দুপুরেই হানাদার বাহিনী বগুড়ার কালীতলায় কয়েকটা বাড়ি তল্লাশী করলো। এর একটা বাড়ি হচ্ছে ফজলুল বারীর। দরজায় ধাক্কা পড়েই বারী সাহেব বেরিয়ে এলেন। হানাদাররা জিজ্ঞেস করলো, “ইয়ে মোকাম তোমহারা হ্যায়?’ জবাব এলো I am Ayub Khan’s man. হাম সাত সাল Minister থা। কিসের কি!

ততক্ষণে মেসিন গান গর্জন করে উঠেছে। প্রাণহীন দেহটা তাঁর মেঝেতে পড়ে গেল। নিজের জীবনের বিনিময়ে তিনি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা উপলব্ধি করলেন। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী দালালীর পুরস্কার পেলেন।

চরমপত্র – ২ জুন ১৯৭১ :

বাংলাদেশে একটা কথা আছে- জাতে মাতাল, তালে ঠিক। সেনাপতি ইয়াহিয়ার এখন সেই অবস্থা। বাহ্যত তাঁর কথাবার্তা আবোল-তাবোলের মতো হলেও আসল কারবারে তার জ্ঞান একেবারে টনটনে। বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে তিনি যখন দেখলেন যে, আওয়ামী লীগ অবিশ্বাস্য ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, তখনই তিনি দেহি পদ-পল্লব-মুদারম্ হয়ে শেখ মুজিবকে ভারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ডাকতে শুরু করলেন।

ভেবেছিলেন শেখ সাহেব ক্ষমতার লোভে পাকিস্তানের ক্লিক রাজনীতির সঙ্গে আপোষ করবেন। কিন্তু যখনই সেনাপতি ইয়াহিয়া বুঝতে পারলেন যে, এ বড্ড শক্ত হাড্ডি, তখনই লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কের ধমক দেখালেন। শুধু তাই-ই নয়, নতুন ফর্মুলার মন্ত্র দিয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ঢাকায় পাঠালেন। সা’বে কইছে কিসের ভাই আল্হাদের আর সীমা নেই।

ভুট্টোর চোখে মুখে কথার খই ফুটতে শুরু করলো। তিনি দৌড়ে এসে ঢাকায় শেখের সংগে বৈঠকে মিলিত হলেন। কথার জাল বিস্তার করে তিনি বঙ্গবন্ধুকে নরম করার প্রচেষ্টা করলেন। কিন্তু শেখের এক কথা ‘আমরা সবাই যখন গণতন্ত্র, গণতন্ত্র বলে চেঁচাচ্ছি, তখন পার্লামেন্টের ফ্লোরেই সব কিছুর ফয়সালা হবে।’

ভুট্টো তাঁর যুক্তি ঘুরিয়ে বললেন, ‘পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ আর পশ্চিম পাকিস্তানে পিপলস পার্টি যখন বেশি আসন পেয়েছে তখন পার্লামেন্টের বাইরে এ দুটো পার্টির মধ্যে একটা সমঝোতা হওয়া দরকার। কিন্তু শেখ ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে বললেন, ‘ভুট্টো সাহেব আশা করি আমার জবাব আগেই পেয়ে গেছেন।

আমি গরিব বাঙালিদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না।’ ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যেয়ে চিৎকার করে বললেন, ‘আমার পার্টি ইলেকশনে জিতেছে বিরোধী দলে বসবার জন্য নয়-ইলেকশনে জিতেছে মন্ত্রীত্ব করবার জন্য। কিন্তু আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করায় পাকিস্তানের পার্লামেন্ট এখন কসাইখানায় পরিণত হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানে তার ঘোষণায় একেবারে ‘এনকোর’ ‘এনকোর’ পড়ে গেল। গাড়োল আর কাকে বলবো?

ব্যাস্ এতেই কাজ হলো। সেনাপতি ইয়াহিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ পার্টি আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুরের সাথে কোনোরকম আলাপ আলোচনা ছাড়াই পার্লামেন্টের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলেন। ভাবলেন, এতেই শেখ সাহেব নরম হবেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের আহ্বান জানালেন।

সমগ্র বাংলাদেশ এই জননেতার প্রতি আস্থা জানালো। শুরু হলো সংগ্রামের নতুন পর্যায়। সেনাপতি ইয়াহিয়া নতুন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠলেন। লোক চক্ষুর অন্তরালে রাওয়ালপিণ্ডির সামরিক ছাউনিতে মানব সভ্যতার সবচেয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের Blue Print তৈরী হলো।

আর ইয়াহিয়া লোক দেখাবার জন্য শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনার উদ্দেশ্যে ঢাকায় এলেন। দিনের পর দিন ধরে শেখের সঙ্গে বৈঠক হলো। আর রাতের অন্ধকার নেমে আসবার সঙ্গে সঙ্গে জেনারেল টিক্কা, জেনারেল মিঠা, জেনারেল পীরজাদার সঙ্গে শলাপরামর্শ হলো। বিশ্বের ইতিহাসে এতবড় বিশ্বাসঘাতকতা আর ভণ্ডামীর নজীর নেই। ২৫শে মার্চ রাতে নিরস্ত্র বাঙালির উপর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিয়ে সেনাপতি ইয়াহিয়া চোরের মতো করাচীতে পালিয়ে গেলেন।

২৬শে মার্চ বেতার ভাষণে ইয়াহিয়া তার আসল চেহারায় বেরিয়ে এলেন। প্রায় দশদিন ধরে ঢাকায় শেখ মুজিবের সঙ্গে আলাপ আলোচনার পর তিনি হঠাৎ করে ঘোষণা করলেন, শেখ মুজিব হচ্ছে রাষ্ট্রের শত্রু- এবার আর তাকে রেহাই দেয়া হবে না। তিনি সদম্ভে প্রকাশ করলেন, শেখ মুজিব তাকে পাকিস্তানকে খণ্ডবিখণ্ড করবার ফর্মুলায় প্রায় রাজি করিয়ে ফেলেছিলেন আর কি? ভাগ্যিস এম.এম. আহমদ কর্নেলিয়স আর ভূট্টো ঢাকায় যেয়ে হাজির হয়েছিল?

সেনাপতি ইয়াহিয়া কচি খোকা আর কি! নাক টিপলে তার দুধ বেরিয়ে আসে। শেখ মুজিব সেই কচি খোকা ইয়াহিয়ার হাতে মুড়ির মোয়া দিয়ে ভুলাচ্ছিলেন। কি অদ্ভুত যুক্তি! খান সাহেব আরো বললেন, আওয়ামী লীগাররা সব রাষ্ট্রের শত্রু। তাই আওয়ামী লীগ বেআইনী করা হলো। তাহলে এই রাষ্ট্রের শত্রুদের সংগে বাছাধন এতদিন কথাবার্তা বলছিলেন কেন? নাকি শেখ সাহেব তোমার সাথে গোপন আঁতাত করলেই দেশ প্রেমিক হয়ে যেতো?

মাস খানেক যেতেই সেনাপতি ইয়াহিয়া আবার ভোল পাল্টে ফেললেন। কিন্তু তাল তার ঠিকই রয়েছে। এম.এম. আহমদ লন্ডন-ওয়াশিংটন করেই এত্তেলা পাঠলেন, যেনোতেনো প্রকারে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পাঁয়তারা করতে হবে। অমনি সব নির্বাচিত প্রতিনিধিদের খোঁজ পড়লো। ইয়াহিয়ার হাতের ব্যাটনটা

চরমপত্র,  ৩ জুন ১৯৭১ :

আজ একটা ছোট্ট কাহিনী দিয়ে শুরু করা যাক। বেশ কয়েক বছর আগেকার কথা। তখন কলকাতা থেকে স্টেট্‌ম্যান বলে ইংরেজি কাগজটা আমাদের বাংলাদেশে বিক্রি হতো। একদিন হঠাৎ করে দেখা গেল যে, এই Stateman পত্রিকার সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় একটা ছোট্ট সংবাদ ছাপানো হয়েছে। সংবাদটা হচ্ছে ঢাকার বুড়িগঙ্গার পানি দূষিত হওয়ায় সমস্ত মাছ মরে গেছে। আর যায় কোথায়?

ইডেন বিল্ডিংস-এ ডিরেক্টর অব পাবলিক রিলেসন্স অফিসে জোর দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেল। পেপার Clippings থেকে শুরু করে নতুন ফাইল তৈরি হলো। Very Urgent-এর লাল Flap দেয়া ফাইল Noting-এ ভরে গেল। পূর্ব বাংলার অবাঙালি চিফ সেক্রেটারি প্রেসনোট ইস্যু করবার নির্দেশ দিলেন। প্রেসনোটে বলা হলো, ভারতীয় সংবাদপত্রের নির্লজ্জ আর মিথ্যা প্রচারণা। বুড়িগঙ্গা নদীর পানি দূষিত হয়নি এবং মাছও মরেনি।

চরমপত্র, জুন মাস ১৯৭১ - এম আর আখতার মুকুল
এম আর আখতার মুকুল

পাকিস্তানের সংবাদপত্রগুলোতে ফলাও করে এ সংবাদ প্রকাশিত হলো আর বেতার কেন্দ্রগুলো কয়েক দফায় এই একই প্রেসনোট প্রচার করলো। কিন্তু মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মাথায় পূর্ব বাংলার অবাঙালি চিফ সেক্রেটারি জিহ্বায় কামড় দিয়ে বসলেন। পুরো attack টাই Misfire হয়ে গেছে। লেজ তুলে ভালো করে দেখাই হয়নি যে, এটা খাসী না পাঁঠা।

স্টেট্‌স্‌ম্যান কাগজে আজ থেকে পঁচাত্তর বছর আগে’-এ নামে একটা কলাম রয়েছে। আর সেই কলামেই ছাপানো হয়েছে যে, পঁচাত্তর বছর আগে ঠিক এই দিনে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর পানি দূষিত হওয়ায় মাছ সব মরে গেছে। সংগে সংগে order হলো চাপিস- অর্থাৎ কিনা চে-পে যাও।

পাকিস্তান হানাদার বাহিনী অধিকৃত ঢাকা বেতার কেন্দ্রের এখন এই চাপিস্-এর অবস্থা হয়েছে। এক একটা Propaganda misfire করছে আর পর মুহূর্তেই তা চাপিস্ হয়ে যাচ্ছে। তাইতো এক সময় এ বেতার কেন্দ্রের নাম হয়েছিল- ইয়ে গায়েবী আওয়াজ হ্যায়।’ হতা খানেক আগে হানাদার হেড কোয়ার্টার থেকে নির্দেশ এল ‘জোর Propaganda চালাও যে লাখ লাখ বাঙালি শরণার্থী পশ্চিম বাংলায় চলে গেছে বলে India সরকার যে দাবি জানাচ্ছে তা মিথ্যা। সব লোক কলকাতার ফুটপাতে পড়েছিল।

সেসব বেকার লোকগুলোকে কতকগুলো Camp-এ এনে India Government এই প্রচারণা চালাচ্ছে। দিন কয়েক পরেই order এল চাপিস্। অর্থাৎ এ Propaganda লাইনটা গড়বড় হয়ে গেছে।

কেননা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মায় জাতিসংঘ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ বাঙালি ভারতে চলে যাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সাধ্যমতো সাহায্য দেয়ার চেষ্টা করছে। এর মধ্যেই কানাডা সরকার ভারতে চলে যাওয়া শরণার্থীদের জন্যে দেড় কোটি টাকা সাহায্যের কথা ঘোষণা করেছেন। নরওয়ে সরকার ৭৯ লাখ ২০ হাজার টাকার সাহায্য মঞ্জুর করেছে। আর পশ্চিম জার্মান সরকার দুই দফায় ৪০ লাখ টাকার রিলিফের কথা প্রকাশ করেছেন।

চরমপত্র, জুন মাস ১৯৭১ - এম আর আখতার মুকুল
এম আর আখতার মুকুল

জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল উত্থান্টের আবেদনেই বিভিন্ন দেশ ভারতে চলে যাওয়া বাঙালি শরণার্থীদের জন্যে সাহায্য দিতে শুরু করেছে। সুইডিশ সরকার বিশ লাখ সুইস মুদ্রা মঞ্জুর করেছে। আর ফরাসি সরকার জাতিসংঘের মাধ্যমে সাহায্য দানের কথা বলেছে। এমনকি নিউজিল্যান্ড সরকার ৪ লাখ ৩২ হাজার টাকা রিলিফ দিয়েছেন। অমনি পাকিস্তানের জঙ্গী সরকারের মুখ দিয়ে লালা পড়তে শুরু করলো। ই-ই-ই এতো টাকা হতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।

সেবার তো বাংলাদেশে নভেম্বরের সাইক্লোনে দশ লাখ লোক মারা যাওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যে নগদ ৮৫ কোটি টাকা সাহায্য এসেছিল তা গড়ামারা হয়েছিল। সেই টাকার জোরেই তো মাত্র নব্বুই দিনের মাথায় সংখ্যাগুরু বাংলাদেশে সশস্ত্র আক্রমণ চালানো সম্ভব হলো। তাই ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকারের advisor দের বুক মোচড় দিয়ে উঠলো। এখন এই টাকাগুলো হাত করার বুদ্ধি কি? অমনি আব্বাজান অর্থাৎ ইয়াহিয়াকে দিয়ে করাচীতে একটা সাংবাদিক সম্মেলন করানো হলো।

একি কথা শুনি আজি মন্থরার মুখে! সেনাপতি ইয়াহিয়া বাঙালি শরণার্থীদের বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকায় দাওয়াত করে পাঠিয়েছেন। শুধু তাই-ই নয়, ২০টা Reception counter খোলার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন order তেমনি কাজ। সামরিক ট্রাকে করে কিছু ছোরা, চাকু, রাইফেল আর মেসিনগান এসব Reception counter-এর সাজ-সরঞ্জাম হিসেবে হাজির হলো।

আর ঢাকার ‘গায়েবী আওয়াজ’ থেকে হুক্কা হুয়া, হুক্কা হুয়া রব উঠলো। ভাইসব আল্লাহর ওয়াস্তে আপনারা Back করুন। আপনাদের জন্য Reception counter খোলা হয়েছে। কিন্তু কিসের কি? Reception counter এর বড় বড় গোঁফওয়ালা লোকগুলো বসে বসে মাছি মেরে পাহাড় করে ফেললো। তবুও একটা শরণার্থী ফিরে এল না।

বরং এদিকে এক উল্টো দুঃসংবাদ এসে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকার অবস্থাপন্ন অবাঙালিরা প্রতি সপ্তাহে ২/৩ জাহাজ ভর্তি করে চট্টগ্রাম থেকে করাচীতে চলে যাচ্ছে। সিলেট, কুড়িগ্রাম, বরিশাল আর সাতক্ষীরা এলাকায় মুক্তিফৌজের হাতে হানাদার বাহিনী গাবুর মাইর খাওয়াতেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

জেনারেল ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকার এখন চোখে মুখে সর্ষের ফুল দেখছেন। তাই পাঞ্জাবের লেঃ জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজীকে বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকার ইস্টার্ন কম্যান্ডের জি.ও.সি. নিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া জেনারেল নিয়াজীকে আবার ডেপুটি মার্শাল ল’ এ্যাডমিনিস্ট্রেটরের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। জেনারেল টিক্কার শরীরটা একটু খারাপ যাচ্ছে বলেই এ নয়া Arrangement করা হয়েছে।

এদিকে পূর্বাঞ্চলের Nineth Infantry Division-এর প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ নেওয়াজকে ‘অপদার্থ’ বলে পশ্চিম পাকিস্তানে বদলি করা হয়েছে। এর জায়গায় মেজর জেনারেল শের আলী এসেছেন। গত দু’মাসের যুদ্ধে হাজার কয়েক হানাদার সৈন্য বাংলাদেশের মাটিতে নিহত হওয়ায় ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকার এখন অস্থির হয়ে উঠেছে।

পাকিস্তানের কতকগুলো বেয়াড়া সংবাদপত্রে এসব খবর প্রকাশ হওয়াতেই সেনাপতি ইয়াহিয়ার সাঙ্গ-পাঙ্গোরা রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠেছেন। লাহোরের ‘আফাক’ পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশ থেকে পাওয়া খারাপ খবরগুলো চাপিস না করায় পাঁচ হাজার টাকা জামানত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু ‘সাপ্তাহিক আফাক’ গোমর ফাঁক করে দিয়েছে।

এরা লিখেছে, বাংলাদেশে যুদ্ধ শেষ হওয়া তো দূরের কথা, সেখানে বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানী সৈন্য মারা যাচ্ছে। আর বাঙালিদের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়াতেই বাংলাদেশের এই স্বাধীনতার লড়াই শুরু হয়েছে। আর যায় কোথায়? ‘আফাকের’ ভিটায় এখন ঘুঘু চরছে। এদিকে লাহোরের উর্দূ দৈনিক আজাদের সম্পাদক ও প্রখ্যাত সাংবাদিক আব্দুল্লাহ মালেককে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড আর ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

বেচারা আব্দুল্লাহ বাংলাদেশের সংবাদ চাপিস্ না করে ফাঁস করে দিয়েছিল। একেবারে আস্ত আহাম্মক আর কি? ঢাকার ‘গায়েবী আওয়াজ’ অফিস থেকে কিছুদিনের ট্রেনিং নিলেই ঠিক লাইনটা বুঝতে পারতো। এখন Mango Gunny bag both gone! আমও গ্যালো, ছালাও গ্যালো! জেলও হলো- জরিমানাও হলো। বাছাধন কিসের পাল্লায় পড়েছো এখন বুঝেছো তো?

চরমপত্র,  ৪ জুন ১৯৭১ :

সেনাপতি ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকার এখন বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকায় এক ‘বিদিকিছছি’ অবস্থায় পড়ে গেছে। কেননা বহু তেল পানি খরচ করে ইয়াহিয়ার পরামর্শদাতা এম.এম. আহম্মদ বিশ্ব ব্যাংকের একটা ছয় সদস্য মিশনকে দাওয়াত করে এনেছেন। এই মিশন এখন সরেজমিনে বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পর্যলোচনা করছেন।

এম.এম. আহম্মদ নিউ ইয়র্কে বড় গলায় বলে এসেছিলেন যে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ আয়ত্বাধীনে আর অবস্থা শান্ত হয়ে গেছে। বিশ্ব ব্যাংকের সাহায্য পেলেই প্রাচুর্যের জোয়ার এসে যাবে। বিশ্ব ব্যাংক মিশন ঢাকায় এসে ভিম্‌রি খেয়েছেন। তেজগাঁও বিমানবন্দরের চেহারাটা একেবারে ভিয়েতনামের নিউ বিমানবন্দরের মতো মনে হচ্ছে।

একাত্তরের রণাঙ্গনের অনুপ্রেরণা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রর অনুষ্ঠান "চরমপত্র"।
একাত্তরের রণাঙ্গনের অনুপ্রেরণা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রর অনুষ্ঠান “চরমপত্র”।

চারদিকে বিমানবিধ্বংসী কামানগুলো আকাশের দিকে হা করে তাকিয়ে রয়েছে। আর অজস্র বাংকার তৈরি করে হানাদার সৈন্যরা তাদের স্বদেশের পালিয়ে যাবার একমাত্র বিমানবন্দরটা পাহারা দিচ্ছে। আশেপাশে কোনো বেসামরিক লোক নেই বললেই চলে। খালি দলে দলে আমি জওয়ানরা মার্চ করে যাচ্ছে।

একটু খবর নিয়েই বিশ্ব ব্যাংকের সদস্যদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। বাংলাদেশের বেশির ভাগ এলাকাতেই কোনো ট্রেন চলাচল করছে না। দু’একটা জায়গায় হানাদার সৈন্যরা অনেক কষ্টে ট্রেন সার্ভিস চালু করেছিল। কিন্তু মুক্তিফৌজের গেরিলা Action-এ তাও বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অসংখ্য ব্রিজ আর Culvert ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

রাস্তাঘাটগুলোর অবস্থা আরও কুফা হয়ে রয়েছে। Inter District-ট্রাক-সার্ভিসগুলো অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দর দুটো বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। সেখানকার ডকগুলেতে কোনো শ্রমিক নেই বললেই চলে। হানাদার বাহিনী বিপুল বিক্রমে নিরস্ত্র ডক শ্রমিকদের হত্যা করাতেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এখন সেই হানাদার বাহিনী আবার ডক শ্রমিক খুঁজে বেড়াচ্ছে। কী করুণ অবস্থা।

আর এদিকে আভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন সংস্থার কর্মচারীদের কাজে যোগ দেয়ার জন্যে আবার আহ্বান জানানো হয়েছে। গত দশ সপ্তাহে এবার দিয়ে ছ’বার এ ধরনের আবেদন করা হলো। এবারের আবেদনে আগের মতোই ভয়াবহ শাস্তি দেয়া হবে বলে শাসানো হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ, তেজগাঁ আর টঙ্গীর শিল্প এলাকার খবর নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের সদস্যদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেছে। তিন পার্সেন্ট। অর্থাৎ কিনা শতকরা তিন ভাগ শ্রমিক কাজে যোগ দিয়েছে। অবশ্য এদের কেউই বঙ্গভাষী নয়। এদের এখন একটাই Duty, সেটা হচ্ছে তেল দেয়া। অর্থাৎ কিনা মিলের যন্ত্রপাতিগুলোতে যাতে জং না পড়ে তার ব্যবস্থা করা।

তাই বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকার কলকারখানাগুলোর চাক্কা বন্দ্। অবস্থা বেগতিক দেখে হানাদার সৈন্যের একটা দল রফতানী ব্যবসায়ে নেমেছেন। সে এক অদ্ভুত ব্যাপার। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ আর চট্টগ্রামের পাটের গুদামগুলো লুট করে কিছু কাঁচা পাট হানাদার সৈন্যরা জাহাজ বোঝাই করে শিপিং বিল ছাড়াই বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। ব্যাস, ওইখানেই রফতানী ব্যবসার খতম তারাবি হয়ে গেল। হাতের কাছে লুট করার মতো আর পাট নেই- ব্যবসাও নেই।

কিন্তু ঢাকার ‘গায়েবী আওয়াজ’ থেকে এই রফতানী ব্যবসার কথাই জোর গলায়। প্রচার করা হলো। কেননা একথা শুনলেই বাংলাদেশের লোকরা ভাববেন যে, অবস্থা একেবারে Normal হয়ে গেছে। অপূর্ব চিন্তাধারা এদের। আর এরই জন্য ঢাকার ‘গায়েবী আওয়াজ’ অফিসে এদের নোকরি একেবারে পোক্ত হয়ে গেছে।

যাক্ যা বলছিলাম। করাচী আর লাহোরের Stock Exchange থেকে বড্ড দুঃসংবাদ এসে পৌঁছেছে। সেখানকার শেয়ার মার্কেট ধড়-ধড় করে পড়ে যাচ্ছে। তিন মাস ধরে বাংলাদেশের ব্যবসা বন্ধ হওয়াতেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বেশি না, এর মধ্যেই এসব ব্যবসায়ীর মাত্র চল্লিশ কোটি টাকার লোকসান হয়েছে। আর তাতেই পশ্চিম পাকিস্তানে একটার পর একটা কলকারখানা বন্ধ যাচ্ছে। এখানেই কাহিনীর শেষ নয়। মারাত্মক শ্রমিক অসন্তোষ যাতে করে পশ্চিম পাকিস্তান আচ্ছন্ন করতে না পারে, তার জন্যই বহু ট্রেড ইউনিয়ন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ থেকে আদায় পত্র নেই বললেই চলে। ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকার চলতি আর্থিক বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় চারশ’ কোটি টাকা বিভিন্ন খাতে ট্যাকস আদায় করতে পারবে বলে যে হিসেব করেছিলেন, তা খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। তাই জঙ্গী সরকারের উন্নয়ন বাজেটের ২৩০ কোটি টাকার রাখা হয়েছে। প্ল্যান শিকেয় তুলে

পাকিস্তান একটা অদ্ভুত দেশ। প্রতি বছর এই পাকিস্তান থেকে প্রায় সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকার মাল বিদেশে রফতানী হতো। এর মধ্যে পূর্ব বাংলা থেকে রফতানীর পরিমাণ ছিল প্রায় দু’শ কোটি টাকা। আর বোনাস ভাউচারে বদৌলতে পশ্চিম পাকিস্তান দেড়শ’ কোটি টাকার মাল রফতানী করতো। কিন্তু আমদানীর ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তান বছরে পাঁচশ’ কোটি টাকার মাল আমদানী করতো আর পূর্ব বাংলাকে মাত্র পৌনে দু’শ’ কোটি টাকার দ্রব্য আমদানীর Permission দেয়া হতো।

বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘাটতির সমস্ত টাকাটাই ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকার পশ্চিমা দেশগুলোকে ছাড়াও চীনের হাতে পায়ে ধরে সংগ্রহ করতো। কিন্তু এবার case খুবই খারাপ। বাংলাদেশ আক্রমণ করতেই এক নাস্তানাবুদ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানের সঞ্চিত বৈদেশিক মুদ্রা ও রিজার্ভ সোনার পরিমাণ যেখানে ৯০ কোটি টাকা ছিল; তা এখন ৬০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

‘মাফ চাই মহারাজ’ বলে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি না দিয়ে আর মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে বাকিতে মাল আমদানীর পরও অবস্থা ‘কুফা’ই রয়ে গেছে। অবশ্য সেনাপতি ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকারকে চীন ১০ কোটি টাকা সাহায্য করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের যুদ্ধ চালাতেই তো দিনে দেড় কোটি টাকা খরচ হচ্ছে।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতির এহেন অবনতির দরুণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে শতকরা একশ’ ভাগ L.C. মার্জিন দাবি করা ছাড়াও আন্তর্জাতিক ব্যাংকের গ্যারান্টি চেয়েছেন।

এদিকে পশ্চিমা অর্থনীতিবিদরা হিসেব করে দেখেছেন যেভাবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে তাতে করে আগামী আগস্ট মাসের মধ্যেই ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকার সোজা লালবাতি জ্বালাবে। তাই বৃটেন ও জাপানের বীমা কোম্পানিগুলো পর্যন্ত পাকিস্তানে রফতানীকৃত মালের ইন্স্যুরেন্স করতে অস্বীকার করেছে।

এমনি এক অবস্থায় সেনাপতি ইয়াহিয়ার পরামর্শদাতা এম.এ. আহম্মদ Where is your leg ? বলতে বলতে বিশ্ব ব্যাংকের দরজায় একটা ডুঙ্গি হাতে হাজির হয়েছিলেন। আর সে জন্যেই বিশ্ব ব্যাংকের একটা প্রতিনিধি দল এখন হানাদার দখলকৃত এলাকা সফরে এসেছেন।

অবশ্য বিশ্ব ব্যাংক জানিয়েছে যে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমঝোতা আর শন্তি ফিরিয়ে আনবার পরই কেবল মাত্র সাহায্য আর ঋণ দেয়া হতে পারে। আর একটা কথা। বিশ্ব ব্যাংক মিশনের এই রিপোর্ট দাখিল হলে নিদেন পক্ষে তিন মাস পর শর্ত সাপেক্ষে সাহায্য আসবে। ততদিন সেনাপতি ইয়াহিয়ার দম থাকলে হয়!

চরমপত্র,  ৬ জুন ১৯৭১ :

চরমপত্র, জুন মাস ১৯৭১ - এম আর আখতার মুকুল
এম আর আখতার মুকুল

অল্প শোকে কাতর আর অধিক শোকে পাথর’। সেনাপতি ইয়াহিয়া এখন পরায় পাথর হয়ে গেছেন। আজকাল কারও সাথে বিশেষ বাচিত্ পর্যন্ত করছেন না। এখন বেচারার একেবারে ধান্ধা লাগার অবস্থা। কোন্ দিক রেখে কোন দিক সামলায়। অফিসে বসে টেবিলের দিকে নজর দিলেই দেখতে পাচ্ছেন, একগাদা Urgent File তার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। একটাতে রয়েছে বাংলাদেশে কয়েক হাজার সৈন্য নিহত হবার কাহিনী।

পাশের ফাইলটাতে লেখা আছে আরো কয়েক হাজারের মতো আহত সৈন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরগুলোতে কাতরাচ্ছে। ওপাশের ফাইলটাতে রয়েছে পাকমুদ্রা Devalue করতে হবে আর কেবলমাত্র নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা দেয়ার পরই বৈদেশিক সাহায্য আসবে। এদিককার একটা ফাইলে বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশের গণঅসন্তোষের কথা রয়েছে। আশ্চর্য, সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যাপক গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়ার পরও এসব সংবাদ আসে কিভাবে?

ঐ ফাইলটা আবার কি? এ্যাঁ- ঢাকার ৬৫ জন বাঙালি দালাল বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতিটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো খবরের কাগজে ছাপানো সম্ভব হয়নি। ওয়াশিংটন আর নিউ ইয়র্কের পাকিস্তান এমব্যাসির স্টাফগুলো করে কি? কত চেষ্টা করে এসব দালালদের দস্তখত সংগ্রহ করা হলো। আর মার্কিন কাগজগুলোতে তা ছাপনো সম্ভব হলো না?

জেনারেল টিক্কার নির্দেশে হামিদুল হক চৌধুরীই তো চমৎকার Draft টা করেছিল। এখন আমার হুকুম হচ্ছে, নিউ ইয়র্কে টাইমূস পত্রিকায় বিজ্ঞাপন হিসেবে বিবৃতিটা ছাপানো হোক। আরে এটা আবার কি? করাচী চেম্বার অব কমার্সের চিঠি মনে হচ্ছে। এ ব্যাটাদের নিয়ে আর পারা গেল না।

তোদের বাজার ঠিক রাখার জন্যই তো বাংলাদেশ আক্রমণ করতে হলো। যার জন্য চুরি করি সেই বলে চোর? আহঃ আবার অসময়ে টেলিফোন কেন? হ্যালো : হ্যাঁ কথা বলছি। কি বললে? জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল বিবৃতিদিয়েছেন?

বহু প্রচেষ্টার পরেও সেনা।তি ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকার বাংলাদেশে হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার কথা লুকিয়ে রাখতে পারেনি। জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল উথান্ট তীব্র ভাষায় ইয়হিয়া সরকারের নিন্দা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘পূর্ব বাংলার ঘটনাবলি মানব জাতির ইতিহাসে এক মর্মান্তিক অধ্যায়।’ জাতিসংঘ সাংবাদিক সমিতির এক মধ্যাহ্ন ভোজে উথান্ট এ বিবৃতি দিয়েছেন।

ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকার সংবাদপত্র ও বেতারকেন্দ্রগুলোর উপর পূর্ণ সেন্সরশিপ দিয়েও মানব সভ্যতার সবচেয়ে জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের কাহিনী চেপে রাখতে পারেনি। দাবানলের মতো এসব কাহিনী বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।

এদিকে ওয়াশিংটন থেকে এক ভয়াবহ দুঃসংবাদ এসে পৌঁচেছে। সিনেটের এডওয়ার্ড কেনেডি বলেছেন, আর কতদিন ধরে জেনারেল ইয়াহিয়ার সরকার অবস্থা স্বাভাবিক বলে দাবি করতে থাকবেন? অথচ প্রতিদিনই হাজার হাজার বাঙালি শরণার্থী সীমান্তের ওপারে চলে যাচ্ছে?

সঙ্গে সঙ্গে Agency for International Development সংস্থা ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকারের কাছে কৈফিয়ৎ চেয়েছে? ইয়াহিয়া সরকারের বড় বড় গোঁফওয়ালা জেনারেলরা সব মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে শুরু করলো। হ্যাতাইনরা জানলো ক্যামনে? সবার কপাল কুঁচকে উঠলো। নভেম্বরের সাইক্লোনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রিলিফের মালপত্র আনা নেওয়ার জন্য যে পঞ্চাশটা বড় ধরনের যান্ত্রিক নৌকা দিয়েছিল, সেগুলো আসল কামে না লাগিয়ে এখন বাংলাদেশে সৈন্য যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

ঢাকা করাচী-ইসলমাবাদের বড় বড় মহরথীরা এই ব্যাপার সম্পর্কে Inquiry করে আহম্মক বনে গেছেন। ধর্মের কল নাকি বাতাসে নড়ে। রিলিফের যান্ত্রিক নৌকাগুলো নিয়ে মওলবী সা’বেরা এখন এরকম একটা অবস্থায় পড়েছেন। অদ্ভুত আর অপূর্বভাবে এই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে।

ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকারের মাথায় হঠাৎ করে এক জব্বর প্ল্যান এসেছিল। পাকিস্তানের লোকদের বোঝাতে হবে যে, হানাদার সৈন্যরা বাংলাদেশের নদীমাতৃক বরিশাল, পটুয়াখালী আর গোপালগঞ্জ এলাকায় নির্বিবাদে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেমন চিন্তা তেমনি কাজ।

নভেম্বর সাইক্লোনের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রিলিফের কাজের জন্য যে সব যান্ত্রিক নৌকা দিয়েছিল, সেসব নৌকায় হানাদার সৈন্যদের বরিশালের অভ্যন্তরে নিয়ে যাবার কয়েকটা ফটো তোলা হলো। Special Messenger দিয়ে এসব ফটো করাচীতে এনে পাকিস্তানের বিভিন্ন কাগজে ছাপাবার ব্যবস্থা হলো।

আমেরিকান ইনফরমেশন সার্ভিস থেকে করাচীর Dawn-এ ছাপানো এমনি এক ছবি কেটে ওয়াশিংটনের হেড অফিসে পাঠানো হলো। মার্কিনী অফিসাররা ছবিটা পরীক্ষা করে আঁতকে উঠলো। হ্যাঁ কোনোই ভুল নেই। রিলিফের যান্ত্রিক নৌকাগুলো পাক ফৌজরা এখন দিব্বি বাংলাদেশে ব্যবহার করছে। এখন উপায়?

মার্কিন জনসাধারণের ট্যাক্সের টাকায় মানবতার খাতিরে রিলিফের জন্য এসব যান্ত্রিক নৌকা দেয়া হয়েছিল; সেসব যান্ত্রিক নৌকাই এখন ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকার মানব নিধনের জন্য ব্যবহার করছে। তাই মার্কিন সরকার সেনাপতি ইয়াহিয়ার পাষণ্ড সরকারের কাছে এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।

ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকার ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করেনি যে সামান্য একটা ফটোর জন্য তারা এতটা হেনস্থা হবে। আরে ও ধরনের বেআইনী ও বেইনসাফী কাজ তো হর-হামেশাই করা হচ্ছে। এদিকে এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় সাব কমিটির চেয়ারম্যান মিঃ কর্নেলিয়াস গ্যালাগার সেনাপতি ইয়াহিয়ার সরকারকে শাসিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, ২৫শে মার্চ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানে সামরিক সাহায্য দেয়া সাসপেন্ড করেছে। কিন্তু অবিলম্বে পূর্ব বাংলায় বর্বর হত্যাকাণ্ড বন্ধ করে নির্বাচিত সদস্যদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে শান্ত পরিবেশের সৃষ্টি না করলে, কনসর্টিয়ামের সদস্যভুক্ত সমস্ত দেশের উপর চাপ সৃষ্টি করে ইসলামাবাদকে বেসামরিক সাহায্য প্রদান বন্ধের ব্যবস্থা করা হবে।

কেননা প্রথম দিকে আমরা ভেবেছিলাম এটা হচ্ছে পাকিস্তানের ‘ঘরোয়া ব্যাপার। কিন্তু মানব ইতিহাসের জঘন্য হত্যাকাণ্ডের ফলে ৫০ লাখ শরণার্থী দেশ ত্যাগ করায় এখন এটা পরিষ্কারভাবে একটা আন্তর্জাতিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটায় ইয়াহিয়ার চান্দি অক্করে গরম অইছে। তাই বলেছিলাম, ‘অল্প শোকে কাতর, আর অধিক শোকে পাথর।’ সেনাপতি ইয়াহিয়া অহন পরায় পাথর হয়ে গেছেন।

চরমপত্র, ৭ জুন ১৯৭১ :

খাইছে রে খাইছে। ঢাকার গায়েবী আওয়াজ থাইক্যা আবার জব্বর খবর আইছে। সেনাপতি ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকার এবার নতুন চাল চেলেছেন। তাঁরা ঘোষণা করেছেন যেসব বাঙালি সৈন্য, ইপিআর জওয়ান আর পুলিশ হানাদার বাহিনীকে পথে বসিয়ে মুক্তিফৌজে যোগ দিয়েছে, তাঁরা ফিরে এলে ‘সহানুভূতির সংগে তাদের case consider করা হবে। এসব জওয়ানরা তাঁদের আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়াই ফিরে আসতে পারেন।

বেশি মাত্র ৩৬ হাজার পুলিশ, ১২ হাজার ইপিআর আর ৬ হাজার বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি জওয়ান স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিফৌজে যোগ দিয়েছে। আর এর সঙ্গে হাজার হাজার ছাত্র, শ্রমিক আর যুবক পাকিস্তানের নরপশুদের হত্যার জন্য গেরিলা ট্রেনিং নিচ্ছে। এর মধ্যেই বাংলাদেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে মুক্তিফৌজ গেরিলার গাবুর মাইরের চোটে হানাদার সৈন্যরা দিশেহারা হয়ে উঠেছে। কথায় বলে ওস্তাদের মাইর বিয়ান রাইতে। এখন সেই মাইর কেবল শুরু হয়েছে। তাই ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকার এবার নতুন চাল চেলেছেন।

তাঁরা ঢাকার গায়েবী আওয়াজ থেকে অবিরামভাবে বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর ও পুলিশদের call করেছেন। সে কি আকুলি বিকুলি। এসব বাঙালি জওয়ানদের বিরহে জেনারেল টিক্কা পর্যন্ত ভেউ ভেউ করে কেঁদে ‘হ্যায় ছইরদ্দি,’ ‘হায় গয়জদ্দি’ করে বেড়াচ্ছেন। তিনি ঢাকার গায়েবী আওয়াজকে অর্ডার দিয়েছেন খুব মেলায়েম আর গদগদ স্বরে এদের আহ্বান জানাতে হবে। হেড কোয়ার্টারের নির্দেশ, যেভাবে হোক এসব জওয়ানদের মুক্তিফৌজের হাত থেকে ফিরিয়ে আনতেই হবে। কেননা এদের হাতে গত আড়াই মাসে পাঁচ হাজারেরও বেশি হানাদার সৈন্য নিহত হয়েছে আর দশ হাজারের মতো আহত হয়েছে।

যুদ্ধ যে ভাবে চলছে তাতে আরো কত সৈন্য যে পটল তুলবে তার ইয়ত্তা নেই। তাই সেনাপতি ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকার এখন এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছেন। যদি কোনোমতে এসব বাঙ্গালি জওয়ানদের ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে মুক্তিফৌজ দুর্বল হয়ে পড়বে। এছাড়া এরা যাতে জীবনে আর যুদ্ধ না করতে পারে তার ব্যবস্থা করা হবে। অর্থাৎ কিনা হেই কাম করা হবে।

মে মাসের গোড়ার দিকে হঠাৎ করে নারায়ণগঞ্জ এলাকার লোকেরা দেখতে পেলো, প্রায় শ’দেড়েক লাশ নদীতে ভাসছে। লাশগুলোর হাত পা বাঁধা। খোঁজ করে দেখা গেল ঢাকার অদূরে কিছু ইপিআর জওয়ান রিপোর্ট করেছিল। এরপর ঘটনা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। ট্রাক বোঝাই করে এদের নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটিতে নিয়ে যাওয়া হলো। রাতের ঘন অন্ধকার নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে এদের হাত-পা বেঁধে লাইন করে দাঁড় করানো হলো।

নিশীথ রাতের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে এক ঝাঁক মেশিনগানের গুলি কড়কড় আওয়াজ করে বেরিয়ে গ্যালো। বাঙালি যুবকদের আতক্রন্দনে খোদার আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠলো। নরঘাতকের দল লাশগুলো নদীর পানিতে ফেলে দিলো। শীতলক্ষ্যার পানি বাঙালি তরুণদের তাজা লহুতে লাল হয়ে উঠলো। দিন কয়েক পর্যন্ত আশ পাশের লোকেরা নদীতে হাত পা বাঁধা লাশগুলো দেখে ক্ষোভে দুঃখে উন্মাদ হয়ে উঠলো।

আশ্চর্য এই বীভৎস হত্যাকাণ্ডের মাত্র এক মাসের মাথায় বাংলাদেশের সেই নরপিশাচের দল বাঙালি জওয়ানদের জন্য মায়াকান্না শুরু করে দিয়েছে। দুনিয়ার ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, নাদির শাহ, তৈমুর লঙ্গ, চেঙ্গিস খান ও হিটলারের মতো হত্যাকারীর দল নিরস্ত্র মানুষ আর আত্মসমর্পনকারীদের নির্বিচারে হত্যা করেছে।

এদের কোনো সময়েই সামান্যতম বিবেক কিংবা নৈতিকতাবোধ দেখা দেয়নি। তাই এদের বংশধর সেনাপতি ইয়াহিয়া আধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হত্যার নেশায় মেতে উঠেছে। কিন্তু মুক্তিফৌজের পাল্টা মারে এখন এই হানাদার বাহিনীর নাভিশ্বাস হওয়ায় নয়া মুখোশের আড়ালে তারা নিজেদের কীটদষ্ট বীভৎস জল্লাদের চেহারাটা লুকোবার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু পাপ কোনোদিন চাপা থাকে না।

প্রথমে এই ফ্যাসিস্ট বাহিনী পরাজিত রাজনীতবিদদের দিয়ে একটা ধামাধরা সরকার গঠনের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এতে সামান্যতম উৎসাহ দেখালো না। তাই নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে কিছু হেই জিনিষ খুঁজে বের করবার কাজে নেমেছিল। সেটাও বানচাল হয়ে গেছে। এদিকে বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকায় কোনোরকম প্রশাসন ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হয়নি।

উপরন্তু ওরা বিশ্বের ইতিহাসে বর্বরতম হত্যালীলা চালিয়েও বাঙালি জাতিকে পদানত করতে পারেনি। এর সঙ্গে সঙ্গে গণতান্ত্রিক বিশ্ব আজ ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকারকে জঘন্য ভাষায় ধিক্কার দিতে শুরু করেছে। সেখানে আজ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়ায় সেনাপতি ইয়াহিয়া সরকার একটার পর একটা নতুন চাল চালতে শুরু করেছে।

আন্তর্জাতিক ঠ্যালার চোটে মওলবী সা’বরা দখলকৃত এলাকায় বিশটা Reception counter খুলে চাকু, ছোরা আর মেসিনগান নিয়ে বাঙালি শরণার্থীদের প্রতীক্ষায় রয়েছে। ঢাকার সামরিক কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের কাজে যোগ দেয়ার জন্য প্রাণ জারে জার করে আবেদনের পর আবেদন চালিয়ে যাচ্ছেন। জাতিসংঘে পাকিস্তানের প্রতিনিধি আগা হিলালী সিনেটর এডোয়ার্ড কেনেডির সংগে সাক্ষাতে ব্যর্থ হয়ে খত্ মানে কিনা চিঠি লিখেছেন।

হিলালী সা’ব অক্করে হিলাল হয়ে গেছেন। তিনি লিখেছেন ভারতই যত নষ্টের মূল। ভারত আটকে না রাখলে এদ্দিনে বাঙালি শরণার্থীরা আহহ্লাদে আটখানা হয়ে সব্বাই Reception counter-এর মাধ্যমে দখলকৃত এলাকায় ফিরে আসতো। কি অপূর্ব আর অদ্ভুত যুক্তি। যেনো বিশ্বের কেউই জানে না যে কি অবস্থায় এসব শরণার্থী বাপ দাদার ভিটে ছেড়েছে।

কিন্তু এদিকে যে হানাদার বাহিনীর হালুয়া একেবারে টাইট। ছলে বলে কৌশলে ও ডাহা মিথ্যার আশ্রয় নিয়েও ভুড়িওয়ালা জেনারেলরা আর হালে পানি পাচ্ছেন না। অবস্থা কুফা দেখে এখন খোদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ভাইসব, চইল্যা আসুন। কিসু কমু না। কেইসটা কী? মুক্তিফৌজের পাল্টা মাইরের একটু নমুনাতেই Nervous হয়ে গেছেন? কবে না স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রতিই আহ্বান জানিয়ে বসেন। আপনাদের পক্ষে অসম্ভব কিছুই নেই। তাই বলেছিলাম খাইছে রে খাইছে। ঢাকার গায়েবী আওয়াজ থাইক্যা আবার জ্ববর খবর আইছে।

চরমপত্র, ৮ জুন ১৯৭১ :

ইসলামাবাদ থেকে লালবাতি জ্বালার খবর এসেছে। সেখানকার টাকাগুলো সব কাগজ হয়ে গেছে। সেনাপতি ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকার এবারে একাশি নম্বর ছেড়েছেন। গত আড়াই মাস ধরে ‘অবস্থা স্বাভাবিক’ বলে চেঁচিয়ে মুখের গাইলস্যা দিয়ে ফেনা বের করার পর এখন একদম হঠাৎ করে একাশি নম্বর সামরিক বিধি জারি করেছে।

এই সামরিক বিধির ভাষা পরিস্কার আর প্রাঞ্জল। আজ থেকে পাকিস্তান আর বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকায় কোথাও পাঁচশ’ ও একশ’ টাকার নোট চলবে না। এখন বুঝুন অবস্থাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? কথা নেই, বার্তা নেই ইসলামাবাদের সামরিক জান্তা কলমের এক খোঁচায় কিছু লোককে পথে বসিয়ে দিলেন। আর পথে বসাবেন নাই-ই বা কেন? নিজেরাই যে পথে বসে রয়েছেন।

তাই একাশি নম্বর সামরিক বিধিতে বলা হয়েছে, যাদের কাছে পাঁচশ’ ও একশ’ টাকার নোট রয়েছে, সেসব নোট ৯ই জুনের মধ্যে ব্যাংকে জমা দিতে হবে। তাই বলে জমা দেয়ার সংগে সংগে ভাংচা পাবেন না। পাবেন একটা রসিদ। তাও আবার বাপ-দাদার নাম ঠিকানা লেখাতে হবে। সেই রসিদটা ট্যাকে গুজে বাসায় ফিরে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকবেন। কেননা সরকারের হাতে এখন মাল-পানি একটু Short হয়েছে। ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকার একটা কমিটি গঠন করেছেন।

এই কমিটি তদন্ত করে দেখবেন যে এসব টাকার ট্যাক্স দেয়া হয়েছে কিনা- এসব টাকা ব্যাংক থেকে লুট করা হয়েছে কিনা? এরপর যখন ন’মন তেল পুড়িয়ে রাধা টুং টুং করে নাচবে অর্থাৎ কিনা সামরিক জান্তার কপাল ফিরবে, তখন ভাংচা দেওয়া হবে। অথচ একটু ভালো করে লক্ষ্য করলেই দেখবেন পাঁচশ’ আর একশ’ টাকার নোটের উপর দস্তখত দিয়ে লেখা আছে ‘চাহিবামাত্র পাকিস্তান স্টেট ব্যাংক সমপরিমাণের মুদ্রা দিতে বাধ্য।

এ ব্যাপারে যাতে কোনো ‘ক্যাচালের’ সৃষ্টি না হয় তার জন্য ৮১ নম্বরে চমৎকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকার কোনো কোর্টে এই ৮১ নম্বরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা যাবে না। কি চমৎকার আর কি অদ্ভুত নিরাপত্তার ব্যবস্থা।

যার এক কান কাটা সে রাস্তার একপাশ দিয়ে হাঁটে। আর যার দুই কানকাটা সে রাস্তার মাঝ দিয়ে যায়। সেনাপতি ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকারের এখন সেই অবস্থা। লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে তিনি এখন দিব্বি কান কাটা রমজান হয়েছেন। তালকানা হয়ে একটার পর একটা সামরিক বিধি জারি করে চলেছেন। নিজের দেশের মুদ্রা নিজেই বেআইনী ঘোষণা করে বসেছেন।

আবার নোটিশ দিয়ে দোকান খোলার ব্যবস্থা করেছেন। অর্থাৎ কিনা ব্যাংকগুলো আজ থেকে তিনদিন পর্যন্ত সমস্ত কারবার বন্ধ রেখে প্রত্যেক দিন সকাল ন’টা থেকে রাত ন’টা পর্যন্ত পাঁচশ’ আর একশ’ টাকার নোট জমা নিয়ে রসিদ দিবে। অবশ্য ব্যাংকগুলোর কারবার আগে থেকেই বন্ধ রয়েছে।

সোজা ভাষায় বলতে গেলে আজ থেকে ব্যাংকগুলোকে তিন দিনের জন্যে খোলা রাখার নির্দেশ দেয়া হলো। অবশ্য বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকায় ব্যাংক খোলা বা বন্ধের কোনো বালাই-ই নেই। কেননা ব্যাংকের কোনো কর্মচারীই নেই। হানাদার বাহিনীর স্যাঙাত্রা পয়সা লুটপাটের পর চেয়ার টেবিল পর্যন্ত নিয়ে গ্যাছে। ভাঙ্গা লোহার গেটের চেহারা দেখে বুঝতে হয় অতীতে কোনো এক সময় এখানে একটা ব্যাংকের অস্তিত্ব ছিল।

ইসলামাবাদের সামরিক জান্তা ৭ই জুন রাতে যে প্রেস নোট জারি করেছে তাতে আসল কথাটা ফাঁস হয়ে গ্যাছে। মুক্তিফৌজওয়ালারা পাঁচশ’ আর একশ’ টাকার নোটে জয় বাংলা সিল দিয়ে মুক্ত এলাকায় চালু করেছে।

সেনাপতি ইয়াহিয়া এখন শুধু ইয়া ইয়া করে বেড়াচ্ছেন। তাঁর থলিতে আর মাত্র পঞ্চাশ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা রয়েছে। অথচ জুন মাসের শেষেই পাকিস্তানকে বেশি না মাত্র চার কোটি পাউন্ড অর্থাৎ প্রায় ৪৫ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রার ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানের কলকারখানাগুলো চালু রাখার জন্য নিদেন পক্ষে দশ কোটি টাকার মাল আমদানী অপরিহার্য। এর সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশে হানাদার বাহিনীর জন্য দিনে দেড় কোটি টাকার খরচা।

তাই বিশ্ব ব্যাংকের দক্ষিণপূর্ব এশীয় ডিরেক্টর মিঃ পিটার কারঘিল সম্প্রতি আলোচনার জন্য ইসলামাবাদ সফরে এলে সেনাপতি ইয়াহিয়া তাঁর হাত ধরে হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠেছেন। মিঃ কারঘিলের কাছে পরিষ্কার করে বলেছেন, এই মুহূর্তে পাক মুদ্রা Devalue করতে কোনোই আপত্তি নেই। তবুও কিছু মাল-পানি ঝাড়ো। আর যে পারি না বাবা!

এদিকে পাকিস্তানী শিল্পপতিরা চিৎকার করতে শুরু করেছে। শ্রমিকরা ধর্মঘটের জন্য ঘন ঘন বৈঠক করছে। উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো শিকেয় উঠেছে। হাজার হাজার হানাদার সৈন্যের নিহতের সংবাদে পাঞ্জাবের ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়ে গেছে। মুক্তিফৌজের গাজুরিয়া মাইরের চোটে হানাদার বাহিনীর ত্রাহি মধুসূদন ডাক শুরু হয়ে গেছে।

এখন আবার বাংলাদেশে মুক্তিফৌজ গেরিলারা হানাদার সৈন্যদের জ্যান্ত ধরে নিতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ থেকে অবাঙালি ব্যবসায়ীরা অবস্থা বেগতিক দেখে ‘ভাগো হুয়া রুস্তম হচ্ছে। অর্থাৎ প্রত্যেক সপ্তাহে জাহাজে ভাগতে শুরু করেছে উপজাতীয় সৈন্যরা লুটের মাল বগলদাবা করে দেশে ফেরবার জন্যে উথুস করছে।

জেনারেল টিক্কা বেসামরিক কর্মচারীদের বেতনের শতকরা ৭৫ ভাগের বেশি দিতে পারছেন না। বিদেশে পাকিস্তান এ্যাম্বাসির স্টাফরা শতকরা মাত্র ৬০ ভাগ বেতন বৈদেশিক মুদ্রায় পাচ্ছেন। যে কোনো মুহূর্তে সেটাও বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। বেসামরিক সাহায্যের নাম-গন্ধও পর্যন্ত নেই। সেনাপতি ইয়াহিয়ার চারপাশটা দ্রুত ঝাপসা আর অন্ধকার হয়ে আসছে।

বাংলাদেশের ক্যাদো আর প্যাকের মধ্যে যে হাটু তিনি ডুবিয়েছেন, এখন আর তা উঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এ রকম একটা ‘নট্ নড়ন নট্ চড়ন’ অবস্থায় সেনাপতি ইয়হিয়ার জঙ্গী সরকার নিজেদের মুদ্রা একশ’ রুপেয়া কা নোট সব কাগজ বন যাও। এর পরের ইনস্টলমেন্টে পঞ্চাশ আর দশ টাকার নোটের পালা। তারপর অক্করে বাগোয়াট। তাই বলেছিলাম ইসলামাবাদ থেকে এখন লাল বাতিজ্বালার খবর এসেছে। সেখানকার টাকাগুলো সব কাগজ হয়ে গেছে।

চরমপত্র, ৯ জুন ১৯৭১ :

১৮৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময়কার ছোট্ট একটা কাহিনী দিয়ে আজকের কথা শুরু করা যাক। আমি তখন ঢাকার ইকবাল হলের ছাত্র। ২১শে ফেব্রুয়ারি বিকেল তিনটা দশ মিনিটে মেডিকেল ছাত্রাবাসে পুলিশের গুলি বর্ষণে ছ’জন ছাত্র নিহত হলে ঢাকা শহর এক ভয়ংকর রূপ পরিগ্রহ করলো। ঢাকার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা যাদুমন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজের পাশে এসে দাঁড়ালো। মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সবাই আক্রোশে ফেটে পড়লো।

সন্ধ্যার একটু আগে পলাশী ব্যারাকে রেলওয়ে ক্রসিং-এর ওপাশটায় একটা ছোট্ট রেস্টুরেন্টে বসে চা খাচ্ছিলাম। আমার পাশের টেবিলটাতে একজন বয়স্ক ঢাকাইয়া বসে বিড়ি টানছিল। এমন সময় মাইক লাগানো একটা ভ্যান এসে হাজির হলো। ভ্যানটার পেছনে সৈন্য বোঝাই একটা জিপ পাহারা দিচ্ছে।

মাইকে ঢাকা শহরে কারফিউ জারির কথা ঘোষণা করা হলো। ঢাকাইয়া ভদ্রলোক নিজে নিজেই বলতে লাগলেন ‘কারফিউ দিছে, হালায় কারফিউ দিয়া ডর দেহায়। বাইশ সাল থাইক্যা কারফিউ দেখত্যাছি। কারফিউর মধ্যে মাইয়া অইছিলো। মহল্লার মাইনষে কইলো, মাইয়ার নাম কি থুইবা? হেই মাইয়ার নাম থুইছিলাম কারফিউ বিবি। আর আইজ কারফিউ দিয়া ডর দেহায়?”

সেই ঢাকা শহরে গত ২৫শে মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় আড়াই মাস ধরে রোজই কারফিউ জারি রেখে সেনাপতি ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকার অবিরামভাবে চেঁচিয়ে চলেছে ‘অবস্থা একেবারে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আর ঢাকার অবস্থা স্বাভাবিক বলে প্রমাণ করতে যেয়ে টিক্কা সরকার অদ্ভুত আর অপূর্ব সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। এরা হঠাৎ করে এক নির্দেশ জারি করে বসেছেন। ঢাকা শহরের যেসব পাকা বাড়িতে কামানের গোলার ভয়াবহ চিহ্ন রয়েছে, সেসব বাড়ির মালিকদের বাড়ি মেরামত করতে হবে।

বিশ্ব জনমতের চাপে পড়ে যখন ছ’জন বিদেশী সাংবাদিককে নিয়ন্ত্রিত সফরে আনা হয়েছিল, ঠিক সেই সময় এ নির্দেশ জারি করা হলো। কিন্তু ব্যাপারটা পুরো Misfire করলো। কেননা পাকা বাড়িগুলোর মালিকরা হয় হানাদার বাহিনীর শিকারে পরিণত হয়েছে, না হয় গ্রামের অভ্যন্তরে চলে গেছেন। আর সেখানে হানাদার বাহিনীর স্যাঙাত্রা দিব্বি বসে শিক-কাবার খাচ্ছে। জেনারেল টিক্কার সাধ্য নেই এ হুকুমনামা ফিরিয়ে নেয়ার।

কেননা ইসলামাবাদের নির্দেশেই এ হুকুম দেয়া হয়েছে। স্যাঙাত্রা বাড়ি মেরামতের order শুনে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে টিক্কার দরবারে হাজির হলো। আবার হুকুম হলো বেড়া বানাও। বাঁশের বেড়া বানিয়ে খুঁটি পুতে কামানের গোলার চিহ্নগুলো ঢেকে রাখো। রাতারাতি ঢাকায় বাঁশের দাম আগুন হয়ে গেল।

কিন্তু যত গণ্ডগোল বাঁধলো ঢাকার প্রেস ক্লাবকে নিয়ে। জেনারেল টিক্কার সাগরেদরা বাড়ি মেরামতের হুকুম জারি করলো। কেননা ২৫শে মার্চ রাতে হানাদার বাহিনীর ট্যাঙ্ক থেকে গোলা মেরে প্রেস ক্লাবের দোতলার উপরের লাউঞ্জটা গুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু একি? ক্লাবের প্রেসিডেন্ট আর সেক্রেটারি গেল কোথায়? দু’জনেই লাপাত্তা।

তাই বাড়িটার original মালিকের খোঁজ পড়লো। অনেক খোঁজাখুঁজির পর দেখা গেল মালিক হাতের কাছেই রয়েছে। আর সে মালিক হচ্ছে পূর্ব বাংলা সরকার স্বয়ং। অনেক ভেবে জেনারেল টিক্কা নিজেই নিজের সরকারের উপর নোটিশ জারি করলেন। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকার হানাদার সরকারের সি এন্ড বি বিভাগ ঢাকার প্রেস ক্লাব মেরামত করলো। না করে উপায় নেই। বিদেশী সাংবাদিকেরা তো এই প্রেস ক্লাবেই প্রথমে এসে হাজির হবেন।

ঢাকার বাজার ও বস্তি এলাকাগুলো আগুন ধরিয়ে আর মেসিনগানের বেপরোয়া গুলিতে হাজার হাজার আদম সন্তান হত্যা করার পর যে ধ্বংসস্তূপগুলো অবশিষ্ট ছিল সেসব বুলডোজার দিয়ে সমান করে দেয়া হয়েছে। যে সমস্ত জায়গা এক সময়ে জনপদের কলকোলাহলে মুখরিত ছিল, সেখানে এখন কবরের নিস্তব্দতা নেমে এসেছে।

কিন্তু এতে করেও জেনারেল টিক্কা তার নৃশংসতাকে লুকিয়ে রাখতে পারেনি। সরকার নিয়ন্ত্রিত সফর সত্ত্বেও বিদেশী ঝানু সাংবাদিকদের নজরে সব কিছুই পড়েছে। একজন লিখেছেন ‘হানাদার সৈন্যরা এরকমই বেপরোয়া নিধন কাজ চালিয়েছে যাতে লাশ খেয়ে উদর পূর্তির পর শকুনগুলো পর্যন্ত আর উড়তে পারছে না। খুলনাকে এখন মৃত্যুপুরী বলেই মনে হয়।’

এর দিন দশেক পর আবার ন’জন বিদেশী সাংবাদিককে সরকার নিয়ন্ত্রিত সফরে আনা হলো। জেনারেল টিক্কা এদের বললেন, ‘সব কিছুই স্বাভাবিক হয়ে গেছে, এমন কি স্কুলগুলো পর্যন্ত চালু হয়েছে। হাজার হলেও সাংবাদিক। তাই একটু খোঁজ করতেই আসল ব্যাপারটা এঁদের চোখে ধরা পড়ে গেল। হ্যাঁ, ঢাকায় অনেক ক’টা স্কুলই খোলা হয়েছে।

একজন লিখেছেন, ‘একটা স্কুলের ছাত্র সংখ্যা হচ্ছে আটশ’ সেখানে ছাত্র হাজিরার সংখ্যা হচ্ছে বিশ থেকে তিরিশ জন; আর একটা অবাঙালি অধ্যুষিত স্কুলে ৭৫০ জন ছাত্র পড়তো, সেখানে মাত্র ৭০ জন ফিরে এসেছে। অনেক স্কুলে মিলিটারি ক্যাম্প করেছে। ঢাকার প্রখ্যাত শাহীন স্কুল এর মধ্যে অন্যতম।

সাংবাদিকটি আরো লিখেছেন “খোদ ঢাকা শহরেই মুক্তিযোদ্ধাদের কাজকর্ম শুরু হওয়ার নমুনা পাওয়া গেছে। ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশী নাগরিকরা এ ব্যাপারটা সমর্থন করেছেন। ঢাকায় একজন বাঙালিকে সন্তর্পনে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনাদের আওয়ামী লীগ আর বাংলাদেশ কি এখনো বেঁচে আছে?’ একটু হেসে ভদ্রলোক বললেন, ‘বাংলাদেশ আর আওয়ামী লীগের মৃত্যু নেই।’ বুকের কাছটাতে হাতের ইশারা করে দেখিয়ে বললেন, ‘এই খানটাতে রয়েছে।’

ভদ্রলোকের অদ্ভুত মনোবল দেখে আমি বিমূঢ় হয়ে পড়লাম। আর একজন বাঙালি জানালেন, হানাদার সৈন্যরা দখলকৃত এলাকায় যেভাবে নিরস্ত্র জনসাধারণের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে, তাতে আমাদের অনেকেই হয়তো বা বিজয়ীর বেশে ঢাকা নগরীতে মুক্তিফৌজের প্রবেশের সময় হাজির থাকতে পারবে না। কিন্তু তারা আসবেই আর খুব শিগগিরই আসবে।”

মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টার operation-এ বাংলাদেশকে পদানত করে জেনারেল টিক্কা আর জেনারেল মিঠুঠার দল ঢাকা ক্লাবে ‘বড়া পেগ হুইস্কি’ খাওয়ার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা আজ ভেঙ্গে খান্ খান্ হয়ে গেছে। গত পঁচাত্তর দিন ধরে লড়াই করেও অবস্থার সামান্যতম পরিবর্তন হয়নি। বরং দিন দিন হানাদার বাহিনীর অবস্থা কুফা হয়ে উঠেছে।

এর মধ্যে বেশ কিছু কমিশন্ড অফিসার আর কয়েক হাজারের মতো হানাদার সৈন্য চির নিদ্রায় শায়িত হয়েছে। এছাড়া বিপুল সংখ্যক আহত হয়ে ছটফট করছে। এর মধ্যে আবার পাবনা-যশোর এলাকায় হানাদার সৈন্যদের মধ্যে এক কলেরা শুরু হয়েছে। এর উপর আবার মুক্তিফৌজের ক্যাচকা মাইর শুরু হয়ে গেছে।

বাংলাদেশের অনেক ক’টা জায়গায় মুক্তিফৌজের এই আন্ধারিয়া মাইরের চোটে এখন হানাদার বাহিনী হাউ-কাউ করতে শুরু করেছে। সে এক অদ্ভুত ব্যাপার। দিনের বেলায় এসব হানাদার সৈন্যরা নিরস্ত্র মানুষের উপর অত্যাচার করছে; আর রাতের অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্প আর ট্রেঞ্চের মধ্যে পেলিয়ে যাচ্ছে।

তাই রাতের বেলায় শুরু হয়েছে গেরিলাদের এই আন্ধারিয়া মাইর। ফলে হানাদার বাহিনী এখন অক্করে হুইত্যা পড়ছে। হ্যাতাইনরা অহন থাইক্যা নাকি হুইত্যা হুইত্যা Fight করবো। কেননা সেনাপতি ইয়াহিয়া ওদিকে ইসলামবাদে অখন হুইত্যাই আছেন। আর জেনারেল টিক্কার শরীল্ডা ম্যাজ ম্যাজ করতাছে। অগো রাইত্যের ঘুম অক্করে ছুইটা গেছে।

চরমপত্র, ১০ জুন ১৯৭১ :

করাচীতে শুরু হয়ে গেছে। মানে কিনা করাচীতে গ্যানজাম শুরু হয়ে গেছে। এখানকার লোকজন সব মাতম করতে করতে দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছে। সবার মুখে এক কথা। “গিয়া, গিয়া, তাবা হো গিয়া। পানশ’ আওর একশো রুপেয়াকা নোট সব তাবাহ্ হো গিয়া।” সকাল থেকেই করাচীর প্রত্যেকটা ব্যাংকের সামনে বিরাট লাইন। ধাক্কা-ধাক্কি, মারামারি আর চিল্লাচিল্লাতে করাচীর প্রতিটা মহল্লায় এক মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

সবাই ব্যাংকের লকার থেকে সোনাদানা আর গয়নাগাটি উঠিয়ে নেয়ার জন্যে পাগল হয়ে গেছে। করাচীতে আগে থেকেই খবর রটে গেছে যে, খুব শিগ্‌গিরই তাদের সাধের ইয়াহিয়া সরকার দেশের সমস্ত সোনাদানা বাজেয়াত করবে। কেননা ইসলামবাদের জঙ্গী সরকারের হাত একেবারে শূন্য। বাংলাদেশে যুদ্ধ চালাতে যেয়ে সেনাপতি ইয়াহিয়া অক্কর চিত্তর অইয়া পড়ছেন। যখন যা বুদ্ধি মাথায় আসছে, তখন সেই নির্দেশ জারি করে চলেছেন। পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকের সিন্ধুকগুলো এখন একেবারে সাফা-সোনা নেই।

তাই আন্তর্জাতিক বাজারে পাকিস্তানী টাকা আর কেউই নিতে চাচ্ছে না। সবারই পরিস্কার কথা, সোনা দিয়ে ব্যবসা করো। আর এর ফলে ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকার দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এবারে সোনা সংগ্রহের এক নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এই পরিকল্পনার দুটো অংশ।

একটা অংশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকায় হানাদার সৈন্যের বদলে এখন থেকে সরকারের আওতায় ব্যাংকের লকারগুলো খুলে পাকিস্তানের মালকড়ি পাঠাতে হবে এবং সমস্ত সোনার দোকান লুট করতে হবে। আর একটা অংশে হচ্ছে, ইসলাম আর দেশের বৃহত্তর স্বার্থে পশ্চিম পাকিস্তানীদের সোনা জমা দেয়ার জন্য Appeal করতে হবে।

করাচীতে এ খবর প্রকাশ হবার পরেই এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এখন সবাই মাটির নিচে লাখ লাখ ভরি সোনা পুঁততে শুরু করেছে। আর বড়লোকেরা ব্যাঙ্কের লকারগুলোর উপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। ঠ্যালার নাম জশমত আলী মোল্লা। এখন মওলবী সা’বরা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরেছেন বাংলাদেশ আক্রমণ করে তাদের হাল হকিকত কিভাবে কেরাসিন হচ্ছে অবস্থা বেগতিক দেখে উজিরে খাজানা থেকে ঘন ঘন প্রেস নোট জারি করা হচ্ছে।

আর রেডিও গায়েবী আওয়াজ থেকে ভ্যা ভ্যা করে তারই প্রতিধ্বনি হচ্ছে। জেনারেল টিক্কা এখন মাথায় হাত দিয়ে বসেছেন। এত ঢাক ঢোল পিটিয়েও বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকা থেকে পাঁচশ’ ও একশ’ টাকার নোট একরকম বলতে গেলে ফেরতই পাওয়া যায়নি। কেননা বেশির ভাগ জায়গায় পাকিস্তানী ব্যাংকগুলোর কোনো ব্রাঞ্চের অস্তিত্ব পর্যন্ত নেই। লুট হয়েছে। হানাদার সৈন্য ও রাজাকারের দল এসব ব্যাংক লুট করেছে।

মায় এসব ব্যাংকের ফার্নিচার পর্যন্ত গায়েব হয়ে গেছে। হানাদার সৈন্যদের বেপরোয়া আক্রমণে এসব ব্যাংকের কর্মচারীরা হয় নিহত হয়েছে না হয় আত্মগোপন করেছে। তাই সেনাপতি ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকার বেহায়ার মতো ব্যাংকের কর্মচারীদের কাজে যোগ দেয়ার জন্য অবিরাম ভাবে call করে চলেছেন। শেষ পর্যন্ত নতুন Appointment দেয়া থানার দারোগা C.O. Developments এস.ডি.ও আর জেলার ডেপুটি কমিশনারদের পাঁচশ’ আর একশ’ টাকা জমা নেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

কি অপূর্ব ব্যবস্থা আর দায়িত্ববোধ। অবশ্য জঙ্গী সরকারের এতে কিস্সু যায় আসে না। কেননা টাকা জমা নেয়ার পরে তো আর ভাংচা দেয়া হবে না। দেয়া হবে সাদা কাগজের রসিদ। মাঝ থেকে লোকগুলোর বাপ-দাদার ঠিকানা পাওয়া যাবে আর বাড়ির অবস্থাটাও জানা যাবে।

কিন্তু এ কি? এত হৈ চৈ করার পরও বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকার লোকগুলো টাকা জমা দিল না? মিলিটারি Wireless-এ এসব দুঃসংবাদ যেয়ে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গী সরকারের Advisor রা মাথার চুল ছিড়তে শুরু করেছে। এখন উপায়? মাঝ থেকে হানাদার সৈন্যরা অক্করে চেইত্যা গেছে। এদের মধ্যে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

কেননা হ্যাতাইনগো কাছে বেশ কিছু পাঁচশ’ আর একশ’ টাকার নোট রয়েছে। লুটের বখরা হিসেবে এসব নোট এদের পকেটে এসেছে। এরা কাঁধের স্টেনগান আর মেসিনগান মাটিতে রেখে বুক চাপড়িয়ে ‘ইয়া আলী, ইয়া আলী’ করতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকার প্রতিটি সামরিক ছাউনী থেকে শুরু করে ট্রেঞ্চ আর বাংকারগুলোতে বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে।

কিন্তু উপায় নেই গোলাম হোসেন! ইসলামাবাদের খোদ জঙ্গী সরকারেরই এখন পেরেশান অবস্থা। আল্লাহর মাইর, দুনিয়ার বাইর। টাকা টাকা করেই সেনাপতি ইয়াহিয়া একেবারে ঘাউয়া হয়ে উঠেছেন।

ঠিক এমনি একটা অবস্থায় করাচীতে আবার একটা জব্বর খবর রটে গেছে। পাঁচশ’ আর একশ’ টাকার নোট ফেরৎ না পাওয়ায় জঙ্গী সরকার এবার পঞ্চাশ আর দশ টাকার নোটেরও হেই কাম করে দেবেন। আর যায় কোথায়? জাতির চোটে করাচীর স্টক এক্সচেঞ্চ অনির্দিষ্ট কালের জন্যে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

এখন বুঝুন কোথাকার water কোথায় যেয়ে stand করবে। সেনাপতি ইয়হিয়া বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে আর একটা রেকর্ড করতে চলেছেন। ধ্যাত্তারি না বলে কবে না দেশের সমস্ত ধরনের মুদ্রাই বেআইনী করে বসেন। অবশ্য দিনকে দিন অবস্থা যে দিকে চলেছে তাতে সে অবস্থার আর বেশি দেরী নেই।

কি সোন্দর তখন পাকিস্তান আর বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকায় Barter system চালু হবে। হেট্ গরু হেট্‌ বলে গলায় দড়ি লাগিয়ে গরু টেনে একজনের উঠানে দাঁড় করিয়ে দু’মন চাল নিতে হবে। গোটা দশেক লাউ এনে একসের সাবান কিনতে হবে কিংবা ছেলের অসুখ ভালো করবার জন্য ডাক্তার সা’বের কাছে একটা খাসী নিয়ে হাজির হতে হবে।

সেনাপতি ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকার এখন অক্করে দিগ্‌বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের দোস্ত দেশগুলোর আবার এর মধ্যে বাকিতে মাল দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কনসর্টিয়ামের দেশগুলো টাকা দেয়ার ব্যাপারে আও-শব্দ পর্যন্ত করছে না। আর এদিকে বাংলাদেশে মুক্তিফৌজের গাবুর মাইর শুরু হয়ে গেছে। বড় বড় গোঁফওয়ালা জেনারেলরা সব বাংলাদেশের আঁঠালে মাটির মধ্যে আটকা পড়েছেন।

তারা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছেন- আইতে শাল যাইতে শাল- হ্যার নাম বরিশাল। এখন হেই বরিশালের পানিতে হব্বাই চুবানি খাইতাছে। আর করাচীতে শুরু হয়ে গেছে। মানে কিনা গ্যাজাম শুরু হয়ে গেছে। সবার মুখে এক কথা। “গিয়া, গিয়া সব তাবা হো গিয়া হ্যায় ইয়াহিয়া তুম্‌নে ইয়ে কেয়া কিয়া?”

চরমপত্র, ১১ জুন ১৯৭১

আগেই কইছিলাম হ্যাগো দিয়া কিছুই বিশ্বাস নাই। হ্যারা হগল কাম করতে পারে। কেননা সুযোগ পেলেই পাকিস্তানের এই নরপশুর দল যেমন নিরস্ত্র জনসাধারণের উপর পৈশাচিক বর্বরতার উল্লাসে মাতোয়ারা হয়ে উঠতে পারে, তেমনি ক্যাদোর মধ্যে পড়লে এরা পা পর্যন্ত ধরতে দ্বিধা বোধ করে না। এখন সেনাপতি ইয়াহিয়ার হানাদার বাহিনী সেই ক্যাদোর মধ্যে হুইত্যা আছে। আর তাই ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকার আজকাল আবোল-তাবোল বলতে শুরু করেছে।

২৫শে মার্চ রাতে বাংলাদেশের বীভৎস হত্যাকাণ্ড শুরু করার পর যে হানাদর বাহিনী ঢাকা থেকে সমস্ত বিদেশী সাংবাদিকদের বের করে দিয়েছিল, সেই হানাদার বাহিনী মাত্র একমাসের মাথায় আবার ছ’জন বিদেশী সাংবাদিককে দাওয়াত করে এনেছিল। কিন্তু জঙ্গী সরকারের কপালটাই খারাপ। এসব সাংবাদিকরা ভাঙা একেবারে ফুট করে দিয়েছে।

বাংলাদশে ভয়াবহ নরহত্যা আর নরপশুদের তাণ্ডবলীলার খবরে মানবতার সেবায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আন্তর্জাতিক রেডক্রস বিমান বোঝাই মেডিকেল সাহায্য পাঠালে যে ইয়াহিয়া সরকার এক সময় তা ফেরত দিয়ে সদম্ভে ঘোষণা করেছিল কৈ Aid কা জরুরত নেহী হ্যায় ইয়ে সব্‌ হমলোককা Internal Affair হ্যায়’- সেই ইয়াহিয়া সরকার এখন আন্তর্জাতিক রেডক্রশ ছাড়াও বিশ্বের সমস্ত সাহায্য সংস্থার কাছে দরবার করে বেড়াচ্ছে।

অবশ্য এরা হচ্ছেন জ্ঞান-পাগল। অর্থাৎ যে মুহূর্তে ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকার বুঝতে পারলো যে কাজটা খুবই খারাপ হয়ে গেছে আর ভারতে চলে যাওয়া বাঙালি শরণার্থীদের জন্য বিশ্বের সমস্ত দেশ থেকে মাল-পানি আসতে শুরু করেছে, সেই মুহূর্তে কাঁউ কাউ শুরু করলে। ‘হে বাবা, অন্ধ নাচার বাবা, চাইট্টা ভিক্ষা দাও বাবা।

যে মুহূর্তে ইয়াহিয়া সা’ব টের পেলেন যে জাতিসংঘ আর বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধি বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকা সফর করবেন, সেই মুহূর্তে অন্তত দখলকৃত ঢাকা শহরের অবস্থা স্বাভাবিক দেখাবার জন্য আরও গোটা কুড়ি সামরিক ক্যাম্প খুলে কারফিউ উঠিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। কেননা বিশ্ব ব্যাংক থেকে ইসলামাবাদে এর মধ্যেই একটা টেলিগ্রাম এসেছে ‘দেখ অমাাদের বোকা বানাবার চেষ্টা করো না। আমরা তদন্ত করে আসল ব্যাপারটা জানতে পারবই?’

যখনই জঙ্গী সরকার বুঝতে পারলেন যে, নির্বাচিত প্রতিনি হাতে ক্ষ্যামতা না দেয়া পর্যন্ত পশ্চিমা দেশগুলো থেকে কি বলে মাল-পানি আসবে না, তখনই এদের ঘেটুরা ‘দেশপ্রেমিক’ আওয়ামী লীগ মেম্বারদের খুঁজতে শুরু করে দিলেন। কেননা নিজেদের ইসলাম-পছন্দ নেতারা তো ইলেকশনে গব্বা মেরেছে।

কিন্তু এদিকে ধোলাই শুরু হয়ে গেছে। ইসলামাবাদের সামরিক জান্তার উপর জাতিসংঘ আর পশ্চিমা দেশগুলোর জোর ধোলাই শুরু হয়েছে। চোর ধরা পড়লে পুলিশ যেমন করে কথা আদায়ের জন্য ধোলাই করে, অহন অক্করে হেই ধোলাই হইত্যাছে। কোবানির চোটে জঙ্গী সরকার হগ্গল কথা কইয়্যা ফালাইছে। সেনাপতি ইয়াহিয়া এখন মানুষের চামড়া দিয়ে বানানো ডুগডুগি বাজাতে শুরু করেছেন। আর কসাই টিক্কা রক্তমাখা হাত মুছে চোঙ্গা হাতে নিয়েছেন।

মেসিনগানটা টেবিলের উপর রেখে রেডিওতে বক্তৃতা ঝেড়েছেন। আগের দফায় টিক্কা সা’ব মুক্তিফৌজের বেঙ্গল রেজিমেন্ট, পুলিশ ও ইপিআরের জওয়ানদের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এরপর বাঙালি শরণার্থীদের দরদে দিল জারে জার করে ফিরে আসবার জন্য call করেছিলেন।

আর এবার বাঙালি কৃষক, শ্রমিক, ডাক্তার, মোক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, শিক্ষক, ছাত্র, মুক্তিফৌজ মায় রাজনৈতিক কর্মী ও নেতাদের পর্যন্ত বাড়ি ঘরে ফিরে আসবার দাওয়াত করেছেন। টিক্কা বলেছেন, ‘আপনাদের জন্যে আঃ বাঃ ফ্রি অর্থাৎ কিনা আহার ও বাসস্থান ফ্রি। এখন বুঝুন কোবানির চোটটা কি পরিমাণে হয়েছে।

এদিকে হানাদার বাহিনী লাল সালুর উপর তুলা দিয়ে সাইন বোর্ড লিখে দখলকৃত এলাকায় বিশটা Reception counter খুলেছে। কোরবাণীর খাসি যেমন করে জবাই করবার আগে ভালো করে গোসল করিয়ে জবাই করা হয়, এইড্যা অক্কারে হেই ব্যাবস্থা। কাঁদবাম না হাঁসবাম!

বাংলাদেশে হানাদার বাহিনী পাঁচ লাখ নিরস্ত্র লোককে হত্যা, দুই কোটি লোকে বাস্তচ্যুত আর পঞ্চাশ লাখ লোককে সীমান্তের অপর পারে পাঠিয়ে দিয়ে এখন আবার দাওয়াত দিয়ে Reception counter খুলে বসেছে। কি বিচিত্র এ দেশ সেলুকাস! নরখাদকদের বোঝা উচিত যে, নেড়ে বেলতলায় একবারই যায়। হঠাৎ করে সেদিন ঢাকা শহর একেবারে সরগরম হয়ে উঠলো। ধূসর রংগের

জিপগুলো সব মেসিনগান উঁচিয়ে গবর্ণমেন্ট হাউস অর কুর্মিটোলার মধ্যে জোর দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিল। জব্বর খবর। মেহেরপুর থাইক্য জব্বর খবর আইছে। সেখানে এক হাজার শরণার্থী ফিরে এসেছে। জেনারেল নিয়াজী হেলিকপ্টারে দৌড়ালেন। যেয়ে দেখলেন তার রাজাকারের দল Reception counter-এ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। এক হাজার লোক তারা ঠিকই পেয়েছে। রাতে তাদের ভালো করে।

খাওন-দাওনের পর হেই কামের জন্য নেয়া হয়েছিল। কিন্তু হায় আল্লাহ্! এগুলো তো বাংলায় কথা কয় না, এগুলো উর্দূতে কথা কয়! নিয়াজী অক্করে পিঁয়াজী হয়ে গেলেন। লগে লগে order দিলেন ওসব কিছু বুঝি না। ‘হামকো বাঙালি রিফ্যুজি চাহিয়ে। ও লোগ আগর নেহি আতা হ্যায় তো গাঁও সে পাকড়কে লাও।’ তারপর বুঝতেই পারছেন হেগো কারবারটা।

বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকায় এখন জ্যান্ত লোক ধরবার জন্য হা-ডু-ডু খেলা শুরু হয়ে গেছে। জাতিসংঘের প্রতিনিধি আসার আগেই এসব Reception counter বাঙালি দিয়ে ভরে প্রমাণ করতে হবে যে, শরণার্থীরা পাকিস্তান পা-পা-পায়েন্দাবাদ বলে ফিরে আসতে শুরু করেছে। আর তা হলেই কাম্ ফতে। কোটি কোটি টাকার সাহায্য আসবে। ‘হারবান দেখতে চমৎকার ভাই, হারবান দেখতে চমৎকার।’

আর এদিকে টিক্কা খান সবার উপরে টেক্কা মেরে দিয়েছেন। তিনি বাঙালি শরণার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘আপনারা আইস্যা দেখুন আপনাদের আত্মীয়স্বজনরা কি সোন্দর দেশ গঠনের কামে লাইগ্যা পড়ছে।’ আত্মীয়স্বজনরা বাঁইচ্যা থাকলে তো কাম করবো? নাকি মরা মানুষও আইজ কাইল কাম করে। কিন্তু বেচারা টিক্কা করবে কি? জাঁতি আর কোবানির চোটে অহন আর মুখ দিয়া অক্করে খই ফুটতাছে। তাই টিক্কা সাব এখন সবাইকে ডেকে পাঠিয়েছেন। উনি বৈষ্ণব হয়েছেন।

তাই আগেই কইছিলাম হেগো দিয়া কিচ্ছুই বিশ্বাস নেই। হেরা হগল কাম করতে পারে। হেরা যে কোনো দিন অক্করে পগার পার হইতেও পারে। কেননা হেই টাইম তো আইস্যা গ্যাছে।

চরমপত্র, ১২ জুন ১৯৭১ :

আজ একটা ছোট্ট কাহিনী দিয়ে শুরু করা যাক। সেটা ছিল ১৯৫৪ সাল। আমি তখন ঢাকার ওয়ারী এলাকায় থাকি আর একটা বাংলা কাগজে সাংবাদিকতা করি। প্রথম

সাধারণ নির্বাচনের ডামাডোলে সমগ্র পূর্ব বাংলা তখন সরগরম হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রায় হাজার কয়েক যুক্তফ্রন্ট কর্মীকে বিনাবিচারে কারারুদ্ধ করে বসলো। কিন্তু তবুও হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী অভিযান অব্যাহত থাকলো। ঠিক এমনি একটা সময়ে ঢাকার নারিন্দা এলাকায় একটা জনসভায় গিয়ে হাজির হলাম।

যুক্তফ্রন্টের সভা। তাই অসংখ্য লোক হয়েছে এ সভায়। একের পর এক বক্তারা সব বক্তৃতা করে গেলেন। এরপর সভা মঞ্চ থেকে ঘোষণা করা হলো, আপনাদের মধ্যে কেউ কিছু বলতে চাইলে আসতে পারেন। হঠাৎ করে দেখলাম গলায় মোটা তাবিজ লাগানো একজন ঢাকাইয়া ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে উঠে চেঁচিয়ে বললেন, ‘আমার কিছু কওনের আছিল।’

সভার উদ্যোক্তারা ভদ্রলোককে জায়গা করে সভামঞ্চে নিয়ে এলেন। এরপর শুরু হলো সেই বক্তৃতা। কেন জানি না আজ সতেরো বছর পরেও এ ঢাকাইয়া ভদ্রলোকের বক্তৃতা মনে রয়েছে। ভদ্রলোক শুরুতেই বললেন, ‘ভাইসব বাপ-মায়ে লেখাপড়া হিকায় নাই, তাই আপনাগো মতো লেখচার দিবার পারুম না। তয় আপনাগো কিছু মেছাল হুনামু।’ পাশের লোককে জিজ্ঞেস করে জানালাম ‘মেছাল’ শব্দের অর্থ গল্প।

বক্তা বলেই চলেছেন ‘আমাগো মহল্লার মইধ্যে এক ছ্যামরায় নতুন সাদী করছে। হেই ছ্যামরা অহন হউর বাড়ি যাইবো। খুব সাইজ্যা-গুইজ্যা রওনা অইছে। যাওনের আগে হের মায়ে কইলো ‘দেখ কাউল্যা, হউর বাড়ি যাইতাছোস যা, কিন্তুক একটু শরিয়ত মাইনা চলিস্।’ কাউলা কইলো ‘আম্মা এই শরিয়তটা কেমন এলায় একটু বুঝায়্যা দেন।’ ‘আবে কাউলা হেইড্যা বুঝলি না? এই যে কিস্তি টুপি হান দিলাম, এইড্যারে মইরা গেলেও মাথায় থনে ফ্যালাইবি না। এলায় বুঝছস্।’

ছ্যামরার হউর বাড়ি আবার গেরামের মইধ্যে। যাওনের টাইমে একটা নদী পার হইতে হয়। কাউল্যা যহন নাও দিয়া নদী পার হইত্যাছিলো, তহন আকা মাথার টুপিডা হাওয়ার চোটে অক্করে উড়াল দিয়া পানির মধ্যে পড়লো। কাউলা তো মাথায় হাত দিয়া বইলো— এলায় করি কি?

আম্মায় কইছে শরিয়ত ঠিক রাহিস। মাথার টুপিডা য্যান ঠিক থাকে। তাই অনেক চিন্তা করণের পর কাউলার মাথায় এক জব্বর প্ল্যান আইলো। হে করলো কি পেন্দনের তপনডা খুইল্যা মাথায় বাইন্দ্যা ফ্যালাইলো। হের পর ঘাটে নাইম্যা টিনের সুটক্যেসড়া হাতে লইয়্যা হউর বাড়ি রওনা হইল। এদিকে হইছে কি কাউলার হাউড়ী খিড়কি দিয়া দেখত্যাছে এক পাগলায় মাঠের মধ্যে দিয়া হের বাড়ির দিকে আইত্যাছে। কাছে অওনের পর হাউড়ী অক্করে ভিমড়ি খাইয়া পড়লো।

কি লজ্জা, কি লজ্জা! এইডাতো পাগলা না- এইড্যা হের দামান্দ। এদিকে কাউলা চিল্লাইতাছে ‘আম্মা আমি কিন্তুক শরিয়ত ঠিকই রাখছি। গতর খালি অইলে কি অইবো, মাথার মাইধ্যে কাপড় ঠিকই রাখছি।’

নরঘাতক ইয়াহিয়ার এখন কাউলার অবস্থা, গণতন্ত্রকে দলিত-মথিত করে, কয়েক লাখ আদম সন্তানকে নির্বিচারে হত্যার পর যখন বাংলাদেশ শ্মশানে পরিণত হয়েছে, আর মুক্তিফৗজের আন্ধারিয়া মাইরের চোটে যখন হানাদার বাহিনীর নাভিশ্বাস শুরু হয়েছে আর অর্থনৈতিক দুরাবস্থা ইসলামাদাদের জঙ্গী সরকারকে উন্মাদ করে তুলেছে, তখন সেনাপতি ইয়াহিয়া ইসলাম, শরিয়ত আর সংহতির বিভ্রান্তিকর শ্লোগানকে সম্বল করে বিশ্বের দরবারে যেয়ে হাজির হয়েছেন।

সমগ্র গণতান্ত্রিক বিশ্ব ধিক্কারে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বর্বরতম হত্যাকাণ্ডের নায়ক জল্লাদ ইয়াহিয়া খান এখন ভণ্ডামীর মুখোশ পরে কীটদষ্ট রক্তমাখা নরখাদকের চেহারাটা লুকাবার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।

যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিবেক জাগ্রত হয়ে তথাকথিত পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু বাঙালি জাতির স্বাধীনতাকে স্বীকার করে নেওয়ার জন্যে বুলন্দ আওয়াজ তুলেছে, তখন সেনাপতি ইয়াহিয়া পাঁচ লাখ মানুষের কংকাল মাথায় বিশ্বের দরবারে নির্লজ্জ আর বেহায়ার মতো এখনো চেঁচিয়ে চলেছে ‘আমি কিন্তুক শরিয়ত ঠিকই রাখছি- পেন্দনের তপনডা খুইল্যা মাথায় বাইন্দ্যা ফালাইছি।’

কিন্তু হায় ইয়াহিয়া, তুমি যে একবারে ন্যাংটা। তুম্ আভি একদম ন্যাংগা হ্যায়। তুমহারা শরিয়ত আওর হামলোগকা শরিয়মে আসমান-জমিনকা ফারাক হো গিয়া হ্যায়। তুম আভি কাউলা বন গিয়া।

চরমপত্র, ১৩ জুন ১৯৭১:

সারছে রে সারছে! হেগো কামডা সারছে! সেনাপতি ইয়াহিয়া অক্করে চিৎ হইয়া পড়ছে। ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকার এখন চোখে মুখে সরষের ফুল দেখতে শুরু করেছেন। একাশি নম্বরের সামরিক বিধি একেবারে ব্যুমেরাং হয়ে নিজেদের গায়ে এসে লেগেছে। পাকিস্তানের ধ্বসে পড়া অর্থনীতিকে সামাল দেয়ার উদ্দেশ্যে আর বাঙালিদের শায়েস্তা করবার জন্যে সামরিক জান্তা রাতারাতি পাঁচশ’ ও একশ’ টাকার নোট বেআইনী ঘোষণা করে যে বগল বাজিয়েছিলেন, সেই বগল অহন অক্করে ফাইট্টা গেছে।

করাচী থেকে একটা মার্কিন সংবাদ সরবরাহ সংস্থা খবর দিয়েছে যে, সেখানকার রাস্তাঘাট ও নালাগুলো হাজার হাজার পাঁচশ’ ও একশ’ টাকার নোটে ভরে গেছে। কি চমৎকার ব্যবস্থা। ইয়াহিয়া সরকার কলমের এক খোঁচায় ভানুমতীর খেল দেখিয়েছেন। আর খেল না দেখিয়েই বা উপায় কি? দিনকে দিন পরিস্থিতি যা দাঁড়াচ্ছে, তাতে এখন যে একেবারে গ্যাড়াকলের অবস্থা।

এদিকে পেশোয়ার আর কোয়েটা থেকে খুবই খারাপ খবর আইছে। ইরান ও আফগানিস্তানের সীমানা বরাবর কাস্টম্স Checking দারুণভাবে কড়াকড়ি করবার নির্দেশ হয়েছে। কেননা এলায় হেগো পালা। সেখানকার শিল্পপতি আর ব্যবসায়ীরা সব সোনা পাচার করতে শুরু করেছে।

কেন আপনাগো আবার কি অইলো? এর মধ্যেই ইয়াহিয়া সরকারের উপর আস্তা হারিয়ে ফেললেন? বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকা থেকে পশ্চিমা শিল্পপতিদের ভাগো হুয়া রুস্তমের একটা অর্থ বুঝি। কেননা এখানকার কারবার লাটে উঠেছে।

এছাড়া দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সাতক্ষীরা এমনকি খোদ ঢাকা শহরেই যখন Action মানে কিনা গেরিলা Action শুরু হয়েছে আর মুক্তিফৌজের কোদালিয়া মাইর শুরু হইছে, তহন টাইম থাকতে কাইট্যা, পড়াটা বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু করাচী, লাহোর, কোয়েটা, পেশোয়ার থেকে পাতাড়ি গুটাবার অর্থডা কি? নাকি সেখানেও হেই কাম Begin হয়ে গেছে!

করাচীর কন্ট্রাকটারদের মাথা চামড়াতে শুরু করেছে। জুন মাসের মাঝামাঝি তবু মাল-পানির দেখা সাক্ষাৎ পর্যন্ত নেই। অর্থাৎ কিনা Government থেকে কোনো পেমেন্টই হয়নি- হবার সম্ভাবনাও নেই। এর সঙ্গে সঙ্গে আবার এখন থেকে ব্যাঙ্কের টাকা তোলাই বন্ধ ঘেষণা করা হয়েছে।

এখন বুঝুন কেটা কি? বাংলােদশে যুদ্ধ চালাতে গিয়ে ইয়াহিয়া সা’ব অক্করে পাগলা হয়ে গেছেন। পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে ধার কর্জ পাওয়ার কোনো আশা নেই দেখে এবার ‘মুসলমান, মুসলমান ভাই ভাই’ শ্লোগান দিয়ে জঙ্গী সরকার আরব দেশগুলোর কাছে একটা Chance নিতে চাচ্ছে। করাচী আর ইসলামাবাদে এখন একেবারে সাজ সাজ রব উঠে গেছে।

শিল্পপতি আর ব্যাংকারদের একটি প্রতিনিধিদল সৌদী আরব, সিরিয়া ও কুয়েত সফরে যাবেন। সেখান থেকে ১০ কোটি ডলার ধার আসবে। গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল। নিজেদের Idea তে নিজেরাই ফাল্ পাড়তে শুরু করেছেন। সৌদী আরবের কাছ থেকে ছ’কোটি আর সিরিয়া ও কুয়েতের কাছ থেকে চার কোটি এই হচ্ছে একুনে দশ কোটি ডলার। বড় বড় গোঁফ আর ভুঁড়িওয়ালা জেনারেলদের মুখ থেকে লালা পড়তে শুরু করেছে। যদি আবার কিছু মাল-পানি কামানো যায়।

কিন্তু একি? মধ্য প্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো আবার এর মধ্যেই বাকিতে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে। তাদেরও ঘটে কিছু বুদ্ধি আছে তো। নাকি তাও নাই? ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকারের স্টেট ব্যাংক অক্করে সাফা হওনের খবরেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আমি বলি কি ব্রাদার কসাই- থুক্কু ব্রাদার ইয়াহিয়া একডা কাম্ করবাইন।

হগ্গলেই যখন আপনারে ট্যাহা দিতে চায় না- তহন এলায় কাবুলীয়ালাগো কাছে একবার Chance লউন। আপনার পেয়ারা এম.এম. আহম্মকে এবার তোরখামে পাঠিয়ে দিন। কপালডা ভালো থাকলে কিছু মাল-পানি পেতেও পারেন। যা পারেন গুছিয়ে নিন।

কেননা এদিকে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা আর ঢাকায় জোর হ্যান্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়েছে। ঢাকা, কুমিল্লা আর নোয়াখালীর গ্রামাঞ্চলে আবার দিব্বি জয় বাংলার পতাকা উড়ছে। কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, সাতক্ষীরা আর সিলেটে বিচ্ছুর লাহান পোলাগুলা আরামসে মেসিনগান কাঁধে ঘুরতাছে।

এদিকে আপনার হানাদার বাহিনীর সোলজাররা লুট করা টাকার শোকে আর মুক্তিফৌজের কোদালিয়া মাইরের চোটে আন্ধারের মধ্যে আইজ কাইল বাইর হওন বন্ধ কইর‍্যা দিছে। হেরা তো শ্যাষ। বাংলাদ্যাশে হেগো উপর আজরাইলে আছর করছে। কিন্তুক আপনার লাইগ্যা পরানডা অক্করে ফাইট্টা যাইতাছে।

সেইজন্য বলেছিলাম, সারছে রে সারছে। হেগো কাম্ডা সারছে। সেনাপতি ইয়াহিয়া অহন অক্করে চিৎ হইয়া পড়ছে। আর হুইত্যা হুইত্যা ছাড়তাছে। মানে কিনা সামরিক বিধি ছাড়তাছে। একাশিডা হইছে। আর উনিশডা হইলেই শ্যাষ।

চরমপত্র, ১৪ জুন ১৯৭১ :

চেইত্যা গেছেন। লাহোরের জামাতে ইসলামীর নেতা মওলানা আবুল আলা মওদুদী অহন অক্করে চেইত্যা গেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে পাকিস্তানকে আর্থিক সাহায্য বন্ধের প্রস্তাবের কথা শুনে মওলানা মওদুদী এখন একেবারে রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, জাতীয় সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার জন্যে ইয়াহিয়া সরকারের মার্কিন সাহায্য প্রত্যাখ্যান করা উচিত।

শুধু তাই-ই নয় মওলানা সা’ব আরও বলেছেন যে, নিকসন সরকারের মুখের উপর মার্কিন সাহায্য ছুঁড়ে ফেলে আমেরিকান বিশেষজ্ঞদের এই মুহূর্তে তল্পিতল্পা গুটিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেয়া উচিত। পাকিস্তানী শিল্পপতিদের আদরের দুলাল মওলানা আবুল আলা মওদুদী এলায় গোস্বা করেছেন। পশ্চিমা দেশগুলা থেকে সাহায্য আসার ব্যাপারে সন্দেহ হওয়ায় মওলানা মওদুদী আগে থেকেই মাথার ঘোমটা টেনে মেহেন্দি মাখা দাড়ি লুকিয়ে অভিমান করেছেন।

মওদুদী সা’ব করিৎকর্মা লোক। একবার লাহোরে তার জামাতে ইসলামী দল কাফের ফতোয়া দিয়ে প্রায় দশ হাজার কাদিয়ানী মুসলমানকে হত্যা করেছিল। শেষ পর্যন্ত সেখানে ‘মার্শাল ল’ জারি করে মেজর জেনারেল আজম খান জামাতওয়ালাদের ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা করেছিলেন। আর নরহত্যার দায়ে বিচারে মওলানা মওদুদীর উপর ফাঁসীর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী ভবিষ্যতে কামে লাগতে পারে এই আশায় ফাঁসীর নির্দেশ বাতিল করে দিয়েছিল।

এরপর জামাতে ইসলামী দলের মাইনে করা আমীর মওলানা আবুল আলা মওদুদী তথাকথিত পাকিস্তানে মধ্যযুগীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের জোর সুপারিশ করতে থাকেন। তাঁর মতে বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন করে মক্তব-মাদ্রাসার শিক্ষা চালু করা উচিত। মেয়েদের লেখাপড়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।

নাটক, সিনেমা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বেআইনী ঘোষণা করতে হবে। চুরি ডাকাতির শাস্তি হিসেবে জ্যান্ত মানুষের হাত কেটে দোররা মারতে হবে, আর অমুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে ‘জিম্মী’ বলে ঘোষণা করতে হবে।

১৯৫৬ সাল। মওলানা আবুল আলা মওদুদী পৃথক নির্বাচনের শ্লোগানওয়ালা পতাকা কাঁধে ঢাকায় এসে হাজির হলেন। পল্টন ময়দানে বিরাট সভামঞ্চ তৈরী হলো।

আলাদা ডায়নামা ফিট করে ইলেকট্রিক লাইটের ব্যবস্থা। মঞ্চের উপর এক ইঞ্চি পুরু গালিচা পেতে সোফা সেট বসানো হলো। আর হুজুরদের পানের পিক ফেলবার জন্যে কুলুক-দান আনা হলো। সভাক্ষেত্র একেবারে লোকে লোকারণ্য। হলকুম দিয়ে উচ্চারণ করে চমৎকারভাবে পবিত্র কোরান তেলাওয়াত করা হলো।

এর পর হুজুর বাঙালি মুসলমানদের সবক্ দেয়ার জন্যে যেই মাত্র উর্দুতে মুখ খুলেছেন। আর যায় কোথায়? মাইর রে মাইর- গাজুরিয়া মাইর। হুজুর অক্করে 440yds রেসে ফার্স্ট হইয়্যা গেলেন। এক দৌড়ে কাপ্তান বাজারের কসাই পট্টি। এদিকে ভাঙ্গা সভামঞ্চের পাশে বেশি না আধফুট পরিমাণ ইটের স্তূপ আর কুলুক-দানগুলো উল্টে রয়েছে। পরদিনই মওলানা সাব লাহোর পালিয়ে গেলেন। চল্লিশ হাজার টাকা ব্যয়ে তার সাধের আম জলসার এই পরিণতি হলো।

এরপর মওলানা আবুল আলা মওদুদীর চোট্‌পাট্ পশ্চিম পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ থাকলো। আইয়ুব খান সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্যে ক্ষমতায় আসলে জামাতে ইসলামী তাকে পূর্ণ সমর্থন দিলো। কিন্তু আইয়ুব খানের ফ্যামিলি প্ল্যানিং আর এক লগে চারটা সাদী বন্ধ করণের আইনে হুজুর খুবই খাপ্‌চুরিয়াস হয়ে উঠলেন। তাই আইয়ুব-বিরোধী গণঅভ্যুত্থানের সময় জামাত-আলারা শুধু একটা কামই করলেন। সেটা হচ্ছে, রাস্তার ধারের সমস্ত ফ্যামিলি প্ল্যানিং-এর সাইন বোর্ড ভেঙ্গে ফেললেন।

জেনারেল ইয়াহিয়া ক্ষেমতায় আসার পর মওদুদী সা’বের জামাত অক্করে আহ্লাদে আটখানা। কেননা আইয়ুব খানের যহন দম ফাট্‌ফাট্ অবস্থা, তখন একটা চিঠি লিখে তিনি সেনাপতি ইয়াহিয়াকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন। কি অদ্ভুত আর অপূর্ব ব্যবস্থা।

সেই চিঠিটা বগলে করে সেনাপতি ইয়াহিয়া দিব্বি এসে গদীতে বসে দেশবাসীর প্রতি ফরমান ঝাড়তে শুরু করলেন। ছাগলের দুইটা বাচ্চা দুধ খায় আর বাকীগুলো এমনি আনন্দে লাফাতে থাকে। পাকিস্তানের মওদুদী, ভূট্টো দওলতানার দল ছাগলের বাচ্চার মতোই ফাল্ পাড়তে শুরু করলেন।

১৯৭০ সালের পহেলা জানুয়ারি। সেনাপতি ইয়াহিয়া সমগ্র দেশে রাজনৈতিক কাজকর্ম করবার পারমিশন দিলেন। মওলানা মওদুদীর খুবই খায়েশ ঢাকার পল্টন ময়দানে চৌদ্দ বছর পর একটা জলসায় তকবির ফরমাবেন। যেমন চিন্তা তেমনি কাজ। জামাতে ইসলামীর মাইনে করা কর্মীরা সব কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। রং বেরং-এর অফসেটে ছাপা পোস্টারে ঢাকা শহর ছেয়ে গেল।

চব্বিশটা বেবীট্যাকসিতে মাইক ফিট করে আমজলসার প্রচার করা হলো। বিরাট উঁচু ডায়াস তৈরি করে গালিচা পেতে আবার কুলুক-দানের ব্যবস্থা হলো। আর এবার ট্রাক বোঝাই করে চাকু, ছোরা ও লাঠি মসজিদের ওপাশটায় লুকিয়ে রাখা হলো। হুজুরের আম জলসার এগুলো হলো সরঞ্জাম। এছাড়া মফস্বলের মক্তব-মাদ্রাসা থেকে পাঁচ টাকা দিন হিসেবে বিনা ভাড়ায় ট্রেনে করে

তালবেলেম আনা হলো। হাজার হাজার লোক পল্টনে এসে হাজির হলো। সভার উদ্যোক্তাদের দিল আনন্দে একেবারে ভরে উঠলো। কিন্তু একি? মাইকে অবিরাম চিৎকার করা সত্ত্বেও কেউই বসতে রাজী নয়। জলসার শুরুতেই চট্টগ্রামের জামাতে ইসলামীর আমীর উর্দুতে খালি একটা লাইন বলেছেন যে, পূর্ব বাংলার মুসলমানরা সব হিন্দু হয়ে যাচ্ছে। ব্যাস্ ওইখানেই Full Stop. বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।

আপনারা মনে করবেন না যে পানির বৃষ্টি। এটা হচ্ছে ইটের বৃষ্টি। আরে ইটরে ইট! হাজারে হাজার ইট এসে পড়তে লাগলো। ওদিকে মাইকে অবিরাম চিৎকার হচ্ছে ‘ভাইসব বদরের জঙ্গ শুরু হয়ে গেছে। আপনারা ইয়া আলী বলে লাঠি-ছোরা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ুন।’ কিন্তু কিসের কি? এদিকে নারায়ে তকবির আর জয় বাংলা শ্লোগানের মধ্যে ইটের চোটে হুজুররা সব মতিঝিলের দিকে ভাগোয়াট্ । লড়াই শেষ হলো। দু’জন নিহত আর ১০৬ জন আহত। বাঙালিদের জাত তুলে গালাগালি দেয়ার পরিণতি।

এটাই শেষ। এরপর মওলানা মওদুদীকে আর ক্রেন দিয়ে টেনেও ঢাকায় আনা যায়নি। ১৯৭০-এর ইলেকশনের রেজাল্ট হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানে সাত আর বাংলাদেশে রসগোল্লা অর্থাৎ শূন্য। একটা ছোট্ট গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। এক ছেলে পরীক্ষায় Result out হবার পর বাপের কাছে Progress রিপোর্ট দেখাচ্ছে।

বাপ বললো, ‘ইংরেজিতে মাত্র চার পেয়েছিস।’ ছেলেটা উত্তর দিলো ‘হ্যা’। এরপর বাপ আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘একি, অংক যে শূন্য পেয়েছিস।’ ছেলেটা গম্ভীরভাবে জবাব দিলো, ‘ইংরেজিতে ভালো Result করলে অঙ্কে একটু খারাপই হয়।’ মওলানা মওদুদীর জামাতে ইসলামীর এবারের নির্বাচনে এরকমই Brilliant Result হয়েছে।

এহেন মওলানা মওদুদী যে বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকায় হানাদার বাহিনীর কুফা অবস্থায় একটু চেইত্যা যাবেন তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। এর মধ্যে মুক্তিফৌজ আবার অনেক ক’টা জামাত নেতাকে কোতল করেছে। আর বাকিগুলোকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। তাই বলেছিলাম, চেইত্যা গেছেন। লাহোরের জামাত ইসলামীর আমীর মওলানা মওদুদী অহন অক্করে চেইত্যা গেছেন।

চরমপত্র, ১৬ জুন ১৯৭১ :

ওদিকে দম্ মওলা কাদের মওলা হয়ে গেছে। ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকারের ভাণ্ডাটা ফুটা হয়ে গেছে। কত কষ্ট আর পেরেশানের মধ্যে প্ল্যান করা হলো। রাস্তাঘাটে যাতে করে হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার চিহ্ন দেখতে না পায়, তার জন্যে হেলিকপ্টারে সফরের ব্যবস্থা হলো; অন্য কাজ বন্ধ রেখে বেছে বেছে ভদ্রলোকের মতো চেহারাওয়ালা আর চৌকশ কথা বলতে পারে এমন সব অফিসারদের পাঠিয়ে কসাইখানাগুলো আরে নাঃ নাঃ নাঃ Reception counter গুলো সাজানো হলো।

আর কত কষ্টে গেরামের মধ্যে থেকে কিছু জ্যান্ত বাঙালি ধরে এনে রিফ্যুজি হিসেবে দেখানো হলো। বেডাদের পোলাও-কোর্মা কত কিছু খাওয়াইয়া খুশি করা হলো। আর সেই বেডাগুলা কিনা মাত্র ছত্রিশ ঘণ্টার মধ্যে উল্টা-পাল্টা কথা কইলো। কলিকাল, অহন অক্করে কলিকাল পড়ছে। না অইলে, হের জাতভাইগো দিয়া কত রকমের কথা কওয়াইয়া হেগো চ্যাতইলাম। তবুও বেডাগুলা অওগ্গা কথার মধ্যে আমাগো আসল কামডা সারলো।

হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন। জাতিসংঘের শরণার্থী হাই কমিশনার প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খানের কথাই বলছি। বেচারা সদরুদ্দিন। সেনাপতি ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকারের প্রশংসায় একেবারে পঞ্চমুখ। বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকায় Reception counter গুলোর ঝঝকে তক্তকে অবস্থা দেখে চমৎকৃত হয়েছেন।

বার বার করে সেই সার্টিফিকেটই দিলেন। বললেন, ইসলামাবাদ সরকার বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকায় আসল শরণার্থীদের জন্য জব্বর এন্তেজাম করেছেন। ভাইয়া লোকসব ‘হায় বাঙালি! হায় বাঙালি! বলে জিগির তুলেছেন। কেননা অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে বাঙালি শরণার্থীদের ফিরিয়ে আনতে না পারলে, বিশ্বের সমস্ত দেশের সাহায্য সব হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।

তাই দশ লাখ বাঙালিকে হত্যা, পঞ্চাশ লাখকে দেশত্যাগ আর দু’কোটি বাঙালিকে বাস্তুচ্যুত করবার পর সেনাপতি ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকার এখন নতুন ভ্যাস ধরেছেন। তারস্বরে চিৎকার করেছেন, ‘ভাইসব আইস্যা পড়ুন। আইস্যা দেখফাইন, আনাগো লাইগ্যা কেমন সুন্দর ব্যবস্থা করছি। শুধু এখানেই শেষ নয়, জঙ্গী সরকার এবার জাতিসংঘের কাছ থেকে কিছু মাল-পানি কামাবার জন্য একটা নতুন প্ল্যান Submit করেছে।

ইয়াহিয়া সরকার বলেছে, দেশের সংহতি রক্ষার জন্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যে দ্’কোটি লোককে বাস্তচ্যুত করা হয়েছে, তাদের পূনর্বাসনেরর জন্যে টাকা চাই। কি অদ্ভুত এ অপূর্ব যুক্তি। একথাটা প্রকাশ করে প্রিন্স সদরুদ্দিন বলেছেন যে, ঢাকায় তার প্রতিনিধি এখন এই পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে দেখছেন। ইয়াহিয়া সরকার এখন লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে বসে আছেন। টাকা, টাকা করে হগ্গল কথাই ফাঁস করে দিয়েছেন।

এরা প্রথমে বলেছিল যে, ভারত সরকার মিথ্যে কথা বলছে। কোনো শরণার্থীই সীমান্তের ওধারে যায়নি। কলকাতার ফুটপাথ থেকে কিছু বেকার লোককে ধরে এনে শরণার্থী শিবিরে রেখে ভারত Propaganda চালাচ্ছে। কিন্তু যখন সমস্ত বিশ্ব একমত হয়ে মত প্রকাশ করলো যে, মানবজাতির ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত বেশি শরণার্থী আর কোনো সময় দেশত্যাগ করেনি।

অমনি সোনার চাঁদ পিলা ঘুঘুর দল বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকায় অক্করে Reception counter খুইল্যা মেসিনগান- মাফ করবেন, মাইক ফিট করে বইস্যা রইলেন। আর সদর ইয়াহিয়া বলতে লাগলেন ‘আসল পাকিস্তানীরা’ ফিরে আসলে তার কোনোই আপত্তি নাই। যেমন উনি ধরে নিয়েছেন তার এই দাওয়াতের চোটে লাখ লাখ বাঙালি শরণার্থী ফিরে আসবেন।

শুধু তাই-ই নয়। এর সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার ভারতীয় নাগরিকও এসে হাজির হবেন। কি চমৎকার চিন্তাধারা। মুরগি ঠোটের মধ্যে চাকু লইয়্যা ফেকু ওস্তাগার লেনে অনেক পেরেশান কইর‍্যা কসাই-এর বাড়িতে হাজির হইলো। অহন খালি কষ্ট কইর‍্যা আড়াইড্য পোঁচ দেওন বাকি আর কি!

এদিকে ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকার এত দিনে কবুল করলেন যে, হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর ঝাঁপায়ে পড়ায় বেশি না মাত্র দু’কোটি লোক বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এদের দোহাই পেড়ে যদি জাতিসংঘের কাছ থেকে কিছু খসানো যায়। কেননা মাল পানির অভাবে যে ওদের অবস্থা এখন একেবারে ছেরাবেরা হয়ে গেছে।

হানাদার বাহিনীর লোকদের এর মধ্যেই পুরো বেতন দেয়া আর সম্ভব হচ্ছে না। শতকরা পঁচিশ ভাগ বেতন আজকাল কি বলে Defence Savings Certificate-এ দেয়া হচ্ছে। এভাবে ভাড়াটিয়া হানাদার বাহিনীকে কতদিন ঠিক রাখা যাবে কে জানে? অবশ্য টিক্কা সাব এদের বলেছেন, যা পারো লুটে নাও। কিন্তু কারবারটা আরেক জায়গায় খতর নাক হয়ে গেছে।

পাঁচশ’ আর একশ’ টাকার নোট বেআইনী করায় হানাদার বাহিনী এখন হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরেছেন যে এতদিন ধরে তারা টাকা মনে করে যা লুট করেছিলেন সেগুলো টাকা নয়— সেগুলো হচ্ছে কাগজ। তাই পাকিস্তান আর বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকায় একেবারে হাহাকার পড়ে গেছে। চারদিকে শুধু একটাই আওয়াজ ইয়া আল্লাহ গজব নাজেল হো গিয়া। হায় ইয়াহিয়া তুমনে ইয়ে কেঁউ কিয়া?

যাক, যা বলছিলাম। সাংবাদিকরা হচ্ছে যত নষ্টের মূল। জাতিসংঘের প্রতিনিধি প্রিন্স সদরুদ্দিন আগাখান গত মঙ্গলবার পশ্চিমবাংলার রিফিউজি ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করতে গেলে সাংবাদিকরা প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে হেতাইনেরে অক্করে কাইত কইরা ফেলাইছেন। তাঁরা প্রশ্ন করলেন, কত শরণার্থী ফিরে গেছে? প্রিন্স একটু মিষ্টি হেসে বললেন, ‘তা তো বলতে পারি না।

ওরা যে Figure দিয়েছে, সেটাই আমাদের গ্রহণ করতে হয়েছে। আবার প্রশ্ন হলো, ঢাকা, যশোর, কুমিল্লা প্রভৃতি জায়গায় কি আপনি বাংলাদেশের ভয়াবহ চেহারা দেখেননি?’ এবারে উত্তর এল, যেখানে এত বড় একটা ঘটনা ঘটলো, তার চিহ্ন কি এত তাড়াতাড়ি মুছে ফেলা যায়। সেখানে আমি অনেক পোড়া ঘরবাড়ি দেখেছি।

লাখ লাখ সর্বহারা শরণার্থীদের মাঝ দিয়ে প্রিন্স সদরুদ্দিন যখন গাইঘাট শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করছিলেন, তখন হঠাৎ করে এক তরুণী-নাম তার হাসিনা একটা এগারো মাসের বাচ্চা কোলে প্রিন্সের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমার স্বামী সিরাজুল হক ছিলেন ঢাকার রমনা থানার দারোগা।

২৫শে মার্চ রাতেই নরপশুর দল রমনা থানা আক্রমণ করে আমার স্বামীকে হত্যা করেছে। আমার সোনার সংসার জ্বালিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ক্যানো? কে এর জবাব দেবে? কে এর ক্ষতিপূরণ করবে?’

কোনো জবাবই দিতে পারলেন না প্রিন্স। শুধু ক্ষণিকের তরে চোখ দুটো তাঁর ছল ছল করে উঠলো। এরপর সদরুদ্দিন আগাখান সাংবাদিকদের বললেন, ‘শরণার্থীদের দেশে ফিরে যাওয়াই হচ্ছে সমস্যার সবচেয়ে সন্তোষজনক সমাধান। সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন হলো, কিন্তু কেমন করে ফিরে যাবে?’

প্রিন্স বললেন, ‘আমি রাজনীতির বিতর্কে জড়িয়ে পড়তে চাই না। আমার এজেন্সি মানবতার সেবায় উদ্বুদ্ধ।’ বনগাঁ হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ শরণার্থীদের আর্ত চিৎকারে তিনি ক্ষণিকের তরে দো-মনা হয়ে পড়লেন। পকেটের সাদা রুমালটা বের মুখের ঘাম মুছে বেডে শুয়ে যশোরের কোট চাঁদপুরের পুঁটি বুলেটে ঝাঁঝরা হওয়া পা-দুটোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন।

আবার তাঁর যাত্রা হলো। এবার বয়ড়া সীমান্ত। কিন্তু হেলেঞ্চায় একদল শরণার্থী তাঁর থামিয়ে দিলেন। একজন ভাঙ্গা ইংরেজিতে বললেন, ‘মাত্র বুধবার যখন নরঘাতকের দল গ্রাজুয়েট ভাইকে মাটির নিচে গলা পর্যন্ত মেসিনগান চালিয়ে হত্যা করলো, তখন তারা নিঃস্ব সীমান্ত দিয়েছে। দুপুরের কড়া রোদের বয়ড়া সীমান্তে দাঁড়িয়ে সদরুদ্দিন আগাখান দেখলেন সামনে দিয়েই বাঙালি শরণার্থীদের কাফেলা এগিয়ে আসছে।

ওরা হিন্দু নয়, মুসলমান নয়, মানুষ, ওরা আল্লাহর বান্দা। ওদের ফরিয়াদে খোদার সাত আসমান পর্যন্ত কেঁপে উঠেছে। সঙ্গের সাংবাদিকরা করতেই তিনি বললেন, ‘শরণার্থীরা দেশে গেলে আমি নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিতে পারি না। আমি তো Prophet নই।’ বলেছিলাম ওদিকে মওলা, কাদের মওলা গেছে। সদরুদ্দিন অউগ্গা কথার মধ্যে হেগো আসল কামডা সাইরা ফ্যালাইছে।

চরমপত্র, ১৭ জুন ১৯৭১:

আজ আর একটা ছোট্ট গল্পের কথা মনে গেল। মেয়ের বিয়ে। তাই মেয়ের তার জামাই-এর চরিত্র সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছিল। গ্রামের একজন মাতব্বর গোছের লোকের কাছে ছেলের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেই মাতব্বর সাহেব বললেন, ‘পোলাখান অক্করে সোনার লাখাল, তয় একটা কথা আছে।’

ভদ্রলোক বললেন, ‘ছেলে যখন সোনর মতো তখন আবার এর মধ্যে রয়েছে কেন?’

-‘না, না, আমি কইছিলাম পোলাডা ভালোই, কিন্তু একটুক্ পিঁয়াজ খায়।’

‘সে কথা আজকালকার ছেলেপেলে একটু পিঁয়াজ-টিয়াজ খাবেই।

‘খালি পিঁয়াজ খাইলে তো আপনারে কোনো কিছুই কইতাম না।’

তার মানে?

‘না- এই আর কি? যখন একটুক বেশি ঝাল্‌ল্টা দিয়ে গোস তহন একটুক পিয়াজ খাইতেই হয়, কন?’

‘আপনার মাথা খারাপ হয়েছে? আজকালকার ছেলেরা মাংস খাবে না সেটা

করে সম্ভব?’

মাতব্বর সাহেব মাথাটা খাউজাইয়া বললেন, ‘না, কইছিলাম কি একটুক পানিটার্নি খাওনের খায়েশ হয়, তহন ঝাল্‌গোস খায় কি?’

— চলবে ….

আরও পড়ুন:

error: Content is protected !!